পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের (এজেকে) রাওয়ালাকোটে যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) আয়োজিত লংমার্চে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ২১ জন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। খবর কাশ্মীর টাইমসের।
সোমবারের (২৭ জুলাই) ওই ঘটনাকে গত কয়েক মাসের চলমান আন্দোলনের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। তবে নিহতের সংখ্যা নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে।
জেএএসি নেতারা ও স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ২০ থেকে ২১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ এখনো কোনো মৃত্যুর ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
পুলিশের ভাষ্য, হাসপাতালগুলোতে মরদেহ পৌঁছানো এবং ময়নাতদন্তসহ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
কাশ্মীর টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার রাত পর্যন্ত স্থানীয় সূত্রে নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে তারা হলেন,
বাসিত শাহ, ফাহিম আফজাল, উসমান নাজির, কাশিফ ইয়াকুব, খাজা জারগাম, নঈম বাট, সরদার জাফর পেহলওয়ান, হাজিরার পানাখা এলাকার মুশতাক সাহেবের ছেলে নিসার শাহীন।
জেএএসি ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, নিহতদের মধ্যে আরও রয়েছেন মোহাম্মদ মুজাম্মাল, জারগাম খলিল, ফিদা হুসাইন, সাকিব হানিফ, সাকিব ইসহাক, আরিফ আসগর, উসমান গুল, আরসালান লতিফ দার, নঈম বাট, কামরান মুশতাক, আলী হুসাইন, ফয়সাল সাবির ও সুহাইল মাকবুল।
এছাড়া একজন অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ এখনো পালান্দ্রি হাসপাতালে রয়েছে।
নিহতদের মধ্যে জেএএসি’র জ্যেষ্ঠ নেতা উমর নাজির কাশ্মীরির ছোট ভাই উসমান নাজিরও রয়েছেন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, তার মৃত্যু বিক্ষোভকারীদের মধ্যে আরও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর লংমার্চ
জেএএসি ও সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর সোমবার সেখানকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। আন্দোলনকারীরা সোমবার দুপুর ১টার মধ্যে তাদের দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়েছিল।
তাদের দাবির মধ্যে ছিল, আটক আন্দোলনকারীদের মুক্তি, দায়ের করা ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার, পূর্ববর্তী বৈঠকে হওয়া সমঝোতা বাস্তবায়ন।
শেষমেশ পাক সরকারের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় হাজারো মানুষ রাওয়ালাকোটের উপকণ্ঠে জড়ো হয়ে মুজাফফরাবাদের উদ্দেশে লংমার্চ শুরু করেন।
জেএএসি’র অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী প্রথমে ব্যাপক শেল নিক্ষেপ করে মিছিল থামানোর চেষ্টা করে। পরে দারেক থেকে রাওয়ালাকোট শহরের দিকে অগ্রসর হওয়া বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালানো হয়। তাদের দাবি, কয়েক ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে গুলিবর্ষণ চলেছে এবং এতে বহু মানুষ আহত হন।
হাসপাতাল, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাওয়ালাকোটের একমাত্র সরকারি হাসপাতাল নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় আহতদের সেখানে নেয়া সম্ভব হয়নি। ফলে স্বজন ও স্বেচ্ছাসেবকেরা আহতদের পালান্দ্রি, হাজিরা ও মাং এলাকার হাসপাতালে নিয়ে যান।
আহতদের মধ্যে অন্তত দুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ইসলামাবাদে স্থানান্তর করা হয়েছে। পালান্দ্রি হাসপাতালে শত শত মানুষ রক্তদান করতে জড়ো হন। এদিকে অ্যাম্বুলেন্স ও ব্যক্তিগত গাড়িতে করে সারাদিন আহতদের হাসপাতালে আনা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, রাওয়ালাকোট-পালান্দ্রি সড়কে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে রাওয়ালাকোট ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়, ফলে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এদিন অঞ্চলটির সংঘর্ষের বহু ভিডিও সারাদিনব্যাপী ফেসবুক, এক্স ও হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভিডিওতে আহতদের বহন, রক্তদান, গুলির শব্দ, ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহন এবং সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে থাকা হাজারো বিক্ষোভকারীকে দেখা যায়।
এছাড়া কিছু ভিডিওতে কম্বলে মোড়ানো মরদেহ বহন, অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের নিরাপদ পথ নিশ্চিত করার আবেদন এবং অবরুদ্ধ সড়কের কারণে ব্যক্তিগত গাড়িতে আহতদের হাসপাতালে নেয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। তবে এসব ভিডিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকর্মী দাবি করেছেন, আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে কয়েকজন চিকিৎসককে সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছিল এবং রাওয়ালাকোটের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য
তবে এসব ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন লিয়াকত আলী মালিক বিবিসিকে বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মরদেহ গ্রহণ না করা পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মৃত্যুর সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে পুঞ্চ অঞ্চলের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেলের (ডিআইজি) কার্যালয় এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে জোরপূর্বক রাওয়ালাকোটে প্রবেশের চেষ্টা করে।
পুলিশের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরাই নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গুলি চালিয়েছে, যাতে দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। পাশাপাশি সামাজিকমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার অভিযোগও আনা হয়েছে।
তবে জেএএসি পুলিশের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের মিছিল শান্তিপূর্ণ ছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনী বিনা উসকানিতে শক্তি প্রয়োগ করেছে।
দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পটভূমি
গত প্রায় দুই মাস ধরে সরকার ও জেএএসি’র মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল। বিদ্যুতের উচ্চ বিল, ভর্তুকিযুক্ত গমের মূল্য এবং সুশাসনের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে নতুন মাত্রা পায়, যখন পাকিস্তানে বসবাসকারী শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আইনসভা আসনের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
জেএএসি’র দাবি, এই ব্যবস্থা স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে ক্ষুণ্ন করছে। তবে পাক সরকারের বক্তব্য, সংরক্ষিত আসনগুলো সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত।
নির্বাচনের মধ্যেই রক্তক্ষয়
এদিকে সোমবার থেকেই আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর আইনসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। অঞ্চলটির মিরপুর, কোটলি ও ভিম্বার জেলায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ হলেও রাওয়ালাকোটের সংঘর্ষ পুরো নির্বাচনী পরিবেশকে ছাপিয়ে যায়।
