রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ই মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অভিযান ছিল সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত এবং ওই ঘটনায় অভিযুক্ত ৪১ জনের কাউকেই বাদ দেওয়ার সুযোগ ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘‘হেফাজতের নেতাকর্মীরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রবেশমুখে কর্মসূচি পালন করছিলেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে কয়েকজন হেফাজতকর্মী নিহত হওয়ার পর সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈঠক করে। সেই বৈঠকে হেফাজতের সমাবেশ ঠেকাতে পরিকল্পনা করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রস্তুত রাখা হয়। তার ভাষ্য, পুরো অভিযানটি ছিল ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ বা সুপরিকল্পিত।’’
চিফ প্রসিকিউটরের দাবি, হেফাজতের নেতারা বুঝতেই পারেননি যে মধ্যরাতে তাদের ওপর এমন অভিযান চালানো হবে। অনেকেই তখন ঘুমিয়ে ছিলেন, কেউ জিকির-আজকারে ব্যস্ত ছিলেন, সেখানে শিশুরাও উপস্থিত ছিল। সেই অবস্থায় চারদিক থেকে ঘিরে সাউন্ড গ্রেনেড, গ্রেনেড ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়। প্রসিকিউশনের তদন্তে ঘটনাস্থলেই ৩২ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে এবং আরও অনেকে আহত হন। পরে অনেক ভুক্তভোগী ভয়-ভীতির কারণে সামনে আসেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘তদন্তে তৎকালীন সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও ফুটেজ, বিভিন্ন প্রকাশনা এবং অন্যান্য প্রামাণ্য উপকরণ বিশ্লেষণ করে ৪১ জন অভিযুক্ত ও ৬১ জন নিহতকে শনাক্ত করা হয়েছে। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, তবে যাদের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে, কেবল তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
‘এটি জেনোসাইড’
ওয়াইডস্প্রেড ও সিস্টেমেটিক আক্রমণের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘হেফাজতের কর্মীদের চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে হত্যা করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত শাপলা চত্বরে মধ্যরাতে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়েছে।’ তার মতে, একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত এই হামলা ছিল পরিকল্পিত এবং একই সঙ্গে এটি গণহত্যা (জেনোসাইড)।
তিনি বলেন, ‘নিরস্ত্র আলেম-ওলামা ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচারে হামলা চালানো হয়েছে। পরে ঘটনাটি আড়াল করতে বিভ্রান্তিকর তথ্যও প্রচার করা হয়। এসব কারণেই প্রসিকিউশন ঘটনাটিকে জেনোসাইড হিসেবে বিবেচনা করছে।’
চিফ প্রসিকিউটর জানান, মামলায় জেনোসাইডের পাশাপাশি রাজনৈতিক নিপীড়ন (পলিটিক্যাল পারসিকিউশন) এবং বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আক্রমণের অভিযোগও আনা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের দায়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
‘অধিকারের প্রতিবেদন সহায়ক প্রমাণ’।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওই প্রতিবেদনকে একমাত্র ভিত্তি করা হয়নি। বরং প্রসিকিউশনের নিজস্ব তদন্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সহায়ক (করোবোরেটিভ) প্রমাণ হিসেবে সেটি ব্যবহার করা হয়েছে।’
কেন ৪১ জন?
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘চাইলে আরও অনেক সদস্যকে আসামি করা যেত। কিন্তু প্রসিকিউশন কমান্ড রেসপনসিবিলিটি ও ব্যক্তিগত দায় (ইনডিভিজুয়াল রেসপনসিবিলিটি) বিবেচনায় শুধুমাত্র সেই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে, যাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে।’
তার ভাষ্য, শুধু যারা সরাসরি গুলি চালিয়েছে তাই নয়, যারা অপরাধ প্রতিরোধ করতে পারতেন কিন্তু করেননি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে তাদেরও দায় রয়েছে। বাহিনী প্রধানদের বিরুদ্ধে কমান্ড রেসপনসিবিলিটির পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘মতিঝিল থানার সব পুলিশ সদস্যকে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। কারণ সবাইকে আসামি করলে সেটি অযৌক্তিক হয়ে যেত।’
গ্রেপ্তার ও পলাতক আসামি
চিফ প্রসিকিউটর জানান, ৪১ আসামির মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন। যারা পলাতক, তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হবে এবং অন্য মামলায় আটক থাকা আসামিদের এই মামলাতেও গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ
সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো ঘটনাসংশ্লিষ্ট তথ্য গোপন করা, বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন প্রকাশ এবং অপরাধ আড়াল করতে সহায়তা করা। প্রসিকিউশনের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে প্রাইমা ফেসি (প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য) প্রমাণ রয়েছে। তবে আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ তারা পাবেন।’
‘আমাদের তদন্তে এটি স্পষ্ট জেনোসাইড’
জুলাই-আগস্টের অন্যান্য মামলায় জেনোসাইডের অভিযোগ না থাকার প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন করা হলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আগে কে কী বলেছেন, সেটি আমার বিষয় নয়। আমাদের তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে যে এটি একটি জেনোসাইডের ঘটনা। আমরা বিপুল পরিমাণ নথি ও প্রমাণ সংগ্রহ করেছি, যা আমাদের এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে। আদালতে সেই অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলেই বিচার হবে, আর প্রমাণে ব্যর্থ হলে অভিযুক্তরা আইনের সুবিধা পাবেন।’
