জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের

ট্রাইব্যুনালে সাংবাদিক আশরাফ কায়সারের সাক্ষ্য

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের

ফন্ট সাইজ:

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক আশরাফ কায়সার দাবি করেছেন, ১৯৭২ সাল থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিকাশ ঘটে, যা শেখ হাসিনার শাসনামলে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি করে।

রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দেয়া জবানবন্দিতে তিনি নিজের পরিচয় তুলে ধরে বলেন, ‘তিনি প্রায় ৩৫ বছর ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত এবং বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করেন।’ তিনি জানান, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বিষয়ে তার লেখা ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ বইটি প্রথম ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় এবং সর্বশেষ সংস্করণ ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে।

জবানবন্দিতে আশরাফ কায়সার বলেন, ‘স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে দেশ ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করে।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী মত দমন, রক্ষী বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন, একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়।

তিনি দাবি করেন, একই ধরনের প্রবণতা ২০০৯ সালের পর শেখ হাসিনার শাসনামলেও দেখা যায়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময়ে গুম, খুন, ‘আয়নাঘর’, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, বিতর্কিত নির্বাচন, বিরোধী দল দমন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল করা হয়।

জবানবন্দিতে তিনি ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের অভিযান, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনারও উল্লেখ করেন। তার দাবি, এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় দেশে এক ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে আশরাফ কায়সার বলেন, ‘আন্দোলন দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং দলটির বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতারা কর্মীদের শক্তি প্রয়োগে উৎসাহিত করেছিলেন।’ তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের ঘটনায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদেরও দায় রয়েছে।’ এসব ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আবারও গণবিরোধী শাসনব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

জবানবন্দি শেষে পলাতক আসামি শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী ইসরাত জাহান অনি সাক্ষীকে জেরা করেন।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে বর্ণিত অভিযোগ ও বক্তব্যগুলো সাক্ষী আশরাফ কায়সারের ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দির অংশ; এগুলো আদালতের বিচারাধীন বিষয়ের সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন