আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট ও ভূ-রাজনীতির অন্যতম কৌশলগত ক্ষেত্র মলাক্কা প্রণালীকে পাশ কাটানোর জন্য প্রস্তাবিত ২৯.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মেগাপ্রকল্প ‘ল্যান্ড-ব্রিজ’ বাতিল করতে যাচ্ছে থাইল্যান্ড। বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা বা কোনো নির্দিষ্ট শক্তির ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের চেয়ে নিজেদের অর্থনীতি ও পরিবেশ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।
দ্য এজ মালয়েশিয়া জানিয়েছে, থাইল্যান্ড সরকারের সাম্প্রতিক এক বিশদ সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে আর লাভজনক নয় এবং এটি বাস্তবায়িত হলে মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটবে।
শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে থাইল্যান্ডের অর্থমন্ত্রী একনীতি নিতিতানপ্রাপাস জানিয়েছেন, সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রকল্পটি বন্ধ করার নীতিগত সুপারিশ করেছে। থাইল্যান্ড উপসাগর ও আন্দামান সাগরকে সংযুক্ত করার জন্য তৈরি এই পরিকল্পনার আনুমানিক প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১ ট্রিলিয়ন থাই বাথ (প্রায় ২৯.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১২১.৪ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত)। এ প্রসঙ্গে দেশটির অর্থমন্ত্রী বলেছেন, প্রাথমিক মূল্যায়নে প্রকল্পটি থেকে বড় অর্থনৈতিক লাভের আশা করা হলেও নতুন সমীক্ষা বলছে, এটি চালু হলে সামগ্রিকভাবে থাইল্যান্ড লোকসানের মুখে পড়বে।
প্রস্তাবিত ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ল্যান্ড-ব্রিজের মাধ্যমে জাহাজ থেকে পণ্য নামিয়ে সড়ক ও রেলপথে অন্য সাগরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, যা মলাক্কা প্রণালীতে জাহাজের চাপ এবং সময় দুটোই কমাত। তবে থাই সরকারের হালনাগাদ সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রকল্পটির প্রত্যাশিত আর্থিক রিটার্ন ৮ শতাংশ থেকে আশঙ্কাজনকভাবে কমে ৪.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া কাঙ্ক্ষিত কার্গো পরিবহনের পরিমাণ আগের অনুমানের চেয়ে অন্তত ১৬ শতাংশ কম হতে পারে। বিশ্বখ্যাত শীর্ষ ১০টি শিপিং লাইনের মধ্যে ৯টিই ইতোমধ্যে অন্যান্য প্রতিযোগী রুট ও বন্দরগুলোতে বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করে ফেলেছে। ফলে থাইল্যান্ডের এই প্রকল্পে তাদের আগ্রহ খুবই নগণ্য।
দক্ষিণাঞ্চলীয় উপদ্বীপের উভয় পাশে দু’টি বিশাল সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং সেগুলোকে হাইওয়ে ও রেলপথ দিয়ে যুক্ত করাই ছিল এই প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা—যা মূলত কয়েক দশকের পুরোনো ‘ক্রা খালের’ একটি বিকল্প রূপ। তবে সমীক্ষায় তীব্র সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রানং-এর ইউনেস্কো স্বীকৃত ‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’, গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি এবং সামুদ্রিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চীন তার জ্বালানি আমদানির জন্য মলাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৌশলগত সুবিধা পেতে পারত, যা বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে ভারতের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতো। কিন্তু থাইল্যান্ড ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে না গিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব আর্থিক স্বার্থ ও পরিবেশগত সুরক্ষাকে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছে।
বিশাল বাজেটের এই ল্যান্ড-ব্রিজ গুটিয়ে নিয়ে থাইল্যান্ড সরকার এখন বিকল্প ও বাস্তবসম্মত পথে হাঁটছে। সরকার এখন রানং বন্দরের আধুনিকায়ন করবে এবং আন্দামান উপকূলকে দেশের বিদ্যমান জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করবে, যাতে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন আরও দক্ষ হয়।
দ্য এজ মালয়েশিয়া আরও লিখেছে, অর্থমন্ত্রী একনীতি নিতিতানপ্রাপাস নিশ্চিত করেছেন যে, প্রকল্পটির কারণে সরকারের কোনো প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতি হয়নি; কারণ কোনো জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি এবং অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজও শুরু হয়নি। তবে এই প্রকল্পটি আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। যেকোনো বিশাল অবকাঠামো বিনিয়োগে যাওয়ার আগে বিশদ গবেষণার শুরুতেই দেশের কৌশলগত অগ্রাধিকার এবং পরিবেশগত বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা উচিতবলে জানিয়েছেন থাইল্যান্ডের অর্থমন্ত্রী, একনীতি নিতিতানপ্রাপাস।
কমিটির এই সুপারিশটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছে থাইল্যান্ডের অর্থমন্ত্রী।
