দিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পেলেট গান ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক

দিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পেলেট গান ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক

ফন্ট সাইজ:

জম্মু-কাশ্মীর ও সীমান্তে চোরাচালানকারীদের মোকাবেলায় পেলেট গান বা ছররা গুলি ছোড়ার বন্দুক নয়াদিল্লিতেও ব্যবহার করা হয়েছে। এমন দাবি করেছে দিল্লির যন্তর মন্তরে অংশগ্রহণকারী বিক্ষোভকারীরা। এ নিয়ে ভারতে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলিও পেলেট গান ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) বিক্ষোভ মিছিলে শিক্ষার্থীদের ওপর পেলেট গান ব্যবহারের জন্য কেন্দ্রকে অভিযুক্ত করেছেন বিরোধী দল নেতা ও সাংসদ রাহুল গান্ধী। তিনি ১৯ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারীর আহত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমা প্রার্থনা এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন।

দিল্লি পুলিশ পেলেট গান ব্যবহারের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেও বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাসপাতালের মেডিকো-লিগাল রেকর্ডে উল্লেখ রয়েছে যে, তারা পেলেট গান থেকে ছোঁড়া বা ছররা গুলিতে আহত হয়েছেন। সিজেপির সংসদ অভিমুখে মিছিল চলাকালে নিরাপত্তাকর্মীরা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করলে তারা গুলিবিদ্ধ হন।

এক বিক্ষোভকারী সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, আমি যখন সিজেপির প্রতিবাদ মিছিলে গিয়েছিলাম, ভাবতেও পারিনি যে গুলিবিদ্ধ হব। আমি ভেবেছিলাম পেলেট গান শুধু কাশ্মীরেই ব্যবহার করা হয়। যন্তর মন্তরের কাছে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার মধ্যে আমি গুলিবিদ্ধ হই। ২৫ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারী জানিয়েছেন, ২০শে জুলাই নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরের কাছে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ‘সংসদ চলো’ মিছিল চলাকালে তিনি পেলেট গানের গুলিতে আহত হন। দিল্লির এই বাসিন্দা বলেছেন, সফদরজং হাসপাতাল থেকে পাওয়া তার মেডিকেল রেকর্ডে পেলেট গুলির আঘাতের কথা উল্লেখ আছে। তার শরীর থেকে এখন সমস্ত পেলেট বের করে ফেলা হয়েছে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গুরুগ্রামে কর্মরত ২৫ বছর বয়সী এমবিএ স্নাতক ইরশাদ শেখের ঘটনাটি প্রকাশ করেছে। তিনি জানিয়েছেন, একাধিক পেলেট গুলিতে আহত হয়েছেন। অস্ত্রোপচারের পর লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতাল থেকে ইরশাদ শেখ বলেন, একাধিক পেলেট তার মুখ ও শরীরের উপরের অংশে আঘাত হানে এবং তার চোখ, গাল, নাক, চিবুক, ঘাড়, কাঁধ ও বুক ভেদ করে। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ জুলাইয়ের মিছিলে পেলেট গুলিতে আহত ১৯ বছর বয়সী এক সিজেপি বিক্ষোভকারী তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারেন এবং তার পরিবার জানিয়েছে যে, ডাক্তাররা তার সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা মাত্র ১% দিয়েছেন।
তবে দিল্লি পুলিশ এক্সে পোস্ট করা একটি বিবৃতিতে বলেছে, ২০শে জুলাই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ বাহিনী পেলেট গান ব্যবহার করেছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। দিল্লি পুলিশের কাছে পেলেট গান নেই এবং চলমান বিক্ষোভে তারা তা ব্যবহারও করে না। জনসাধারণকে অনুরোধ করা হচ্ছে, কোনো যাচাইবিহীন বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শেয়ার বা প্রচার করবেন না। এক্সে প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর (পিআইবি) ফ্যাক্ট চেক হ্যান্ডেলে লেখা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও পোস্ট করা হচ্ছে। সেখানে দাবি করা হচ্ছে যে দিল্লিতে পুলিশ বাহিনী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পেলেট গান ব্যবহার করেছে। এই দাবিটি ভুয়া। যাচাইকৃত তথ্যের জন্য সর্বদা সরকারি সূত্রের ওপর নির্ভর করুন।

পেলেট গান, যা পাম্প-অ্যাকশন গান বা রায়ট শটগান নামেও পরিচিত । এই বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়লে তা কয়েক ডজন ছোট ধাতব পেলেট ছড়িয়ে দেয়। এটি সাধারণ বন্দুকের একটিমাত্র গুলির মতো নয়, এগুলো একটি বিস্তৃত এলাকা জুড়ে একাধিক পেলেট ছড়িয়ে দেয়। ভারতে এগুলো প্রধানত সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) এবং জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ হিংস্র জনতার বিরুদ্ধে কম-প্রাণঘাতী জনতা নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বিএসএফ সীমান্তে চোরাচালানকারীদের মোকাবিলাতেও এই প্যালেট গান ব্যবহার করে।

২০১০ সালের অস্থিরতার পর কাশ্মীরে এগুলো চালু করা হয়েছিল, যেখানে পুলিশের গুলিতে ১০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। আসল গুলির তুলনায় প্রাণহানি কমানোর উদ্দেশ্যে এটি একটি বিকল্প হিসেবে আনা হয়।

পেলেট গান ব্যবহারের জন্য আদর্শ কার্যপ্রণালীতে এগুলোকে শেষ অবলম্বন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র বোঝানোর চেষ্টা, সতর্কবার্তা, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস এবং অন্যান্য কম-প্রাণঘাতী পদ্ধতি ব্যর্থ হওয়ার পরেই ব্যবহার করা উচিত। নির্দেশিকা অনুযায়ী, দূর থেকে গুলি চালাতে হবে, কোমরের নিচে লক্ষ্য স্থির করতে হবে এবং পরবর্তী সংস্করণগুলোতে বেশিরভাগ পেলেট নিচের দিকে চালিত করার জন্য ডিফ্লেক্টর ব্যবহার করতে হবে। ব্যুরো অফ পুলিশ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিপিআরডি) এবং সংশ্লিষ্ট প্রোটোকলগুলোতেও সংযম এবং ন্যূনতম বলপ্রয়োগের ওপর জোর দেয়া হয়।

তবে, বিগত বছরগুলোতে কাশ্মীর থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা নথিভুক্ত করা হয়েছে যেখানে অভিযোগ উঠেছে যে এই প্রোটোকলগুলো অনুসরণ করা হয়নি, যার ফলে গুরুতর আঘাত, বিশেষ করে চোখে আঘাতের ঘটনা ঘটেছে। কাশ্মীরের বাইরেও পেলেট-গান ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে হরিয়ানার আম্বালা জেলার শম্ভু সীমান্তে কৃষকদের বিক্ষোভ চলাকালে, কিছু বিক্ষোভকারী পেলেট-গানের গুলিতে আহত হয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন। তবে যন্তর মন্তরের কাছে ২০শে জুলাইয়ের বিক্ষোভ থেকে ওঠা অভিযোগগুলো রাজধানী কেন্দ্রস্থলে, পেলেট গানের আঘাতে সাধারণ নাগরিকদের আহত হওয়ার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ঠিক কতজন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তা এখনও স্পষ্ট নয়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন