বিপজ্জনক মোড়ে যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারে বড় ঝড়ের পূর্বাভাস

সিএনএনের বিশ্লেষণ

বিপজ্জনক মোড়ে যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারে বড় ঝড়ের পূর্বাভাস

ফন্ট সাইজ:

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় বৈশ্বিক তেলের বাজার বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বা পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর গত কয়েক মাসে বিশ্বের তেলবাজার বিভিন্ন বিকল্প সরবরাহপথ ব্যবহার করে বড় ধাক্কা সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধির চাপ তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। যুদ্ধের সময় তেলের দাম বাড়লেও তা ২০২২ সালের ১২৮ ডলার বা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার আগে রেকর্ড ১৪৬ ডলার প্রতি ব্যারেলের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

তবে এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং সেই বিকল্প ব্যবস্থাগুলোও একে একে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, সংঘাত এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এতদিন বাজারে যে ধারণা ছিল যে যেকোনো সংকটেরই বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এবার সেই ধারণা বদলে যেতে পারে।

১০০ ডলার ছাড়িয়েছে তেলের দাম

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ৪ ডলারের ওপরে এবং ডিজেলের দাম ৫ দশমিক ২০ ডলারের বেশি হয়েছে। বন্ডবাজারও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবে চাপ

এতদিন সংঘাত এড়িয়ে লোহিত সাগর হয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন সম্ভব হচ্ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।

ইরানের হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের পথে সরিয়ে নেয়া হচ্ছিল। কিন্তু এখন সেই পথও ঝুঁকিতে পড়েছে। ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর অবরোধের কারণে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

এর ফলে সৌদি আরবের প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

যদিও সুয়েজ খাল হয়ে বিকল্প পথে তেল পাঠানো সম্ভব, তবে বড় আকারের পূর্ণ বোঝাই তেলবাহী জাহাজ ওই পথ ব্যবহার করতে পারে না। ফলে চার সপ্তাহের একটি যাত্রা আট সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।

বীমা নিয়েও নতুন সংকট

সংঘাতের শুরুতে যুদ্ধঝুঁকির কারণে বীমার খরচ বেড়েছিল, কিন্তু জাহাজগুলো অন্তত বীমা পাচ্ছিল। এখন পরিস্থিতি আরও জটিল। ইরান আবারও প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য ১ থেকে ২ ডলার টোল আরোপের পরিকল্পনা করেছে বলে জানা গেছে।

লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (এলএমএ) জানিয়েছে, কোনো জাহাজ যদি ইরানকে এই টোল দেয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট জাহাজের পুরো বীমা বাতিল হয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে টোল না দিলে ইরান হামলার হুমকি দিচ্ছে। ফলে জাহাজগুলো কার্যত কোনো নিরাপদ বিকল্প পাচ্ছে না।

রাশিয়াও বাড়াচ্ছে সংকট

বিশ্লেষকদের মতে, তেলের সংকট এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার এবং কৃষ্ণ সাগরের ক্যাসপিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর ফলে রাশিয়ায় জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হওয়ায় দেশটি ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করেছে। যুদ্ধের আগে রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করত, যা বৈশ্বিক ডিজেল সরবরাহের প্রায় ১২ শতাংশ।
এ ছাড়া কৃষ্ণ সাগরের পাইপলাইনে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক বাজার থেকে প্রতিদিন আরও প্রায় ১৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দ্রুত কমছে বৈশ্বিক মজুত

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো বৈশ্বিক তেলের মজুত দ্রুত কমে যাওয়া। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অপরিশোধিত তেলের মজুত ছিল রেকর্ড উচ্চতায়। কিন্তু গত পাঁচ মাসে সেই মজুত প্রায় ১৩০ কোটি ব্যারেল কমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলভাণ্ডারও ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত বসন্তের পর থেকে সেখান থেকে ১১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশটির বাণিজ্যিক তেলের মজুতও পরিচালনাগত সর্বনিম্ন সীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে।

চীনের মজুতও শেষের পথে

গত কয়েক মাসে তেলের চাহিদা কিছুটা কম ছিল, কারণ যুদ্ধ শুরুর আগেই চীন বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করেছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীন আর বেশিদিন শুধু মজুতের ওপর নির্ভর করতে পারবে না। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে দেশটিকে আবারও বড় পরিসরে তেল আমদানি বাড়াতে হবে।

তেলের দাম কোথায় যেতে পারে?

গোল্ডম্যান স্যাকসের তেলবিষয়ক গবেষণা বিভাগের প্রধান ড্যান স্ট্রুইভেনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে আগামী অক্টোবরের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ২০২২ সালের মতো ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের বেশি হতে পারে।

অন্যদিকে আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের হেলিমা ক্রফটের আশঙ্কা আরও বেশি। তার মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নতুন রেকর্ড গড়ে ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারও অতিক্রম করতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন