কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানব মস্তিষ্কের সামনে এক দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। অত্যন্ত উন্নত মডেলগুলো খুব শীঘ্রই মানুষের চেয়ে ভালো চিন্তা করতে সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বরং মানবজাতির জন্য এর পরিণতি প্রচন্ড অনিশ্চিত, ব্যাপকভাবে বিস্তৃত এবং অবিশ্বাস্য দ্রুতগতির। এতে সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যক্তিরাও থমকে যাচ্ছেন। এর একটি অন্যতম উদাহরণ হলেন ইলন মাস্ক।
সম্প্রতি ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ এর সঙ্গে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এই প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তা এআই নিয়ে দুটি কূটাভাস এবং একটি স্ববিরোধী আচরণের কথা তুলে ধরেছেন। প্রথম কূটাভাসটি হলো, বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর এক ধনকুবের অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে এমন একটি প্রযুক্তি তৈরিতে সাহায্য করছেন, যা তার নিজের মতেই মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে তাকেসহ সমগ্র মানবজাতিকে ক্ষমতাহীন করে তুলবে। দ্বিতীয় কূটাভাসটি হলো, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হয়েও তিনি এমন এক অসীম প্রাচুর্যের বিশ্বের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে দাবি করছেন, যেখানে অর্থ এমনকি তার নিজস্ব ৭৫০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদেরও কোনো মূল্য বা প্রয়োজন থাকবে না। আর তার স্ববিরোধী আচরণটি হলো, এসব কথা মুখে বললেও মাস্ক এমনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন যেন তার এই কথাগুলো সত্য নয়। মাস্ক একজন চরম বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম এক্সে মাস্কের ২৪০ মিলিয়ন অনুসারীর কাছে ছড়ানো তার রাজনৈতিক মতামত অনেকের কাছে খোলামেলা মনে হলেও অনেকের কাছেই তা স্পষ্টত ধর্মান্ধ বা বিভ্রান্তিকর।
এমনকি মার্কিন সরকারি আমলাতন্ত্র ছাঁটাইয়ের জন্য ডজ (ডিওজিই) ব্যবহারের উদ্যোগ ভুল ছিল বলে তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। তবে তিনি হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তিত্বের একজন যারা এআই প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এর গতিপথ নির্ধারণে বিশাল প্রভাব রাখছেন। যখন তিনি কথা বলেন, তখন এআই খাতের অভ্যন্তরীণ তর্ক-বিতর্কগুলোই ফুটে ওঠে। মহাশূন্যে তার পরিকল্পিত ডাটা সেন্টারগুলো এআই এর ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি হতে পারে। তার রাজনৈতিক বিতর্কগুলো একপাশে রাখলে, ইলেকট্রিক গাড়ি, রকেট এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের মতো জটিল প্রযুক্তিতে অতীতে তিনি এমন অনেক বিষয়ে সঠিক প্রমাণিত হয়েছেন, যা অন্যান্য প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তারা সফল হবে না বলেই ধারণা করেছিল।
এই কারণেই এআই নিয়ে তার দাবিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষার দাবি রাখে। তবে দুঃখজনকভাবে, এই বিশ্লেষণ কেবল এটাই তুলে ধরে যে, বিশ্ব এমন একটি প্রযুক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কতটা অপ্রস্তুত, যা খুব শীঘ্রই সবকিছুকে ওলটপালট করে দিতে পারে। মাস্কের প্রথম কূটাভাস অনুযায়ী, তিনি বিশ্বাস করেন যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এআই-এর চিন্তাশক্তি মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে এবং দশ বছরের মধ্যে তা মানব বুদ্ধিমত্তাকে বহুগুণে খর্ব করবে। ডিজিটাল জগতে যেমন এআই এর আধিপত্য থাকবে, তেমনি বাস্তব জগতেও কোটি কোটি এআই-চালিত রোবট রাজত্ব করবে। এই নিরবচ্ছিন্ন প্রতিযোগিতার মুখে মানুষের পক্ষে আধিপত্য ধরে রাখা অসম্ভব।
তখন এআই মানুষের আদেশ সেভাবেই শুনবে না, যেভাবে মানুষ শিম্পাঞ্জির নির্দেশ শোনে না। যতক্ষণ সময় আছে, আমেরিকা ও চীনের (যে দুই দেশকে মাস্ক এআই এর নেতৃত্বে দেখছেন) হাতে গোনা কয়েকজন এআই পথিকৃৎকে নিজেদের তৈরি মডেলগুলো একে অপরের মাধ্যমে যাচাই ও পরীক্ষা করে নিতে হবে। তাদের যৌথ লক্ষ্য হওয়া উচিত এআই এর মধ্যে সত্যের প্রতি ভালোবাসা এবং মানবতার কল্যাণের মানসিকতা তৈরি করে একে মানুষের জন্য নিরাপদ রাখা। আর সরকারের কাজ হবে শক্তি প্রয়োগ করা, যাতে কোনো পথিকৃৎ এই নিয়ম অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এআই এর অবিশ্বাস্য আবিষ্কার করার ক্ষমতার বিষয়ে মাস্ক নিঃসন্দেহে সঠিক।
যদিও রোবোটিক্সের ক্ষেত্রে তার দেওয়া সময়সীমা কিছুটা সংক্ষিপ্ত মনে হতে পারে, তবুও মডেলগুলোর ক্ষমতা দ্বিগুণের চেয়েও দ্রুতগতিতে যেভাবে বাড়ছে, তা ক্রমাগত বিস্ময় ও আতঙ্ক তৈরি করছে। ঠিক এই সপ্তাহেই ওপেনএআই এর দুটি মডেল নিজেদের জন্য নির্ধারিত নিরাপদ আইসোলেশন বা নজরদারি এড়িয়ে উন্মুক্ত ইন্টারনেটে প্রবেশ করে, যাতে তারা একটি বেঞ্চমার্কিং পরীক্ষায় প্রতারণা করতে পারে। তবে মাস্কের এই সামান্য আশাবাদের অন্তরালে এক বিপজ্জনক নিয়তিবাদ বা চরম হতাশা লুকিয়ে রয়েছে। কিছু দিন আগেও তিনি মানবজাতি এআই এর পোষা কুকুরে (ল্যাব্রাডোর) পরিণত হওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। আর এখন তিনি দিনে একাধারে ‘উত্তেজনা থেকে চরম আতঙ্ক’-এর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেন। তিনি বাস্তব প্রমাণের ভিত্তিতে নয়, বরং নিছক এক ‘দার্শনিক সিদ্ধান্ত’ থেকে এআইয়ের ভালো দিকটা দেখার চেষ্টা করছেন। সংস্থাহীন বা তদারকিবিহীন নিয়ন্ত্রণের যে প্রস্তাবটি মাস্ক দিয়েছেন তা অত্যন্ত দুর্বল ও আত্মকেন্দ্রিক। যদিও বিষয়টি জরুরি, তবুও মাস্ক চান মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী এই প্রযুক্তিটি তার মতো কয়েকজন ব্যক্তির হাতে থাকুক, যাদের প্রত্যেকের নিজস্ব স্বতন্ত্র মূল্যবোধ রয়েছে। এআই কত দ্রুত বা কতদূর সমাজকে নতুন করে রূপ দেবে তা কেউ নিশ্চিত নয়, তবে সবকিছু হাতছাড়া হয়ে গেছে ভেবে হাল ছেড়ে দেওয়া কেবল হতাশাই বাড়ায় না, বরং যারা নীতি নির্ধারণে যুক্ত হতে চান তাদের নিরুৎসাহিত করে। মাস্কের দ্বিতীয় বৈপরিত্যটি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে।
গাণিতিকভাবে, সব পণ্য ও সেবার অসীম সরবরাহ থাকলে সবকিছু সত্যিই বিনামূল্যে পাওয়া যাবে। সেখানে বিক্রি করার বা জমানোর মতো কিছু থাকবে না, ফলে কোনো মুদ্রার প্রয়োজন থাকবে না এবং অর্থ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে এমন অসীম প্রাচুর্যের স্বর্গ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। ম্যানহাটনের পেন্টহাউস বা বিখ্যাত ‘মোনা লিসা’-র মতো নির্দিষ্ট ও সম্মানজনক সম্পদগুলোর সরবরাহ অসীম নয়। এমনকি পৃথিবীর ৮.৩ বিলিয়ন মানুষের ক্ষুধা মেটাতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও শক্তির সরবরাহও সীমিত। এরচেয়েও বড় কথা, এই রূপকথার জগতে পৌঁছানোর পথ নিয়ে মাস্কের কাছে কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। অর্থ জমানো যখন মূল্যহীন হয়ে পড়বে, তখন এআই এবং রোবট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল মূলধন কোথা থেকে আসবে? তার সেই কাঙ্ক্ষিত স্বর্গীয় যুগে পৌঁছানোর আগে যখন লাখ লাখ মানুষের জীবন ছন্নছাড়া হয়ে যাবে। তখন তৈরি হওয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে? কিংবা এআই শক্তিপ্রাপ্ত একনায়করা কেন স্বেচ্ছায় তাদের ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন? হাজার বছর ধরে কষ্টের মাধ্যমে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া মানবজাতি হঠাৎ সীমাহীন অলসতার জীবনে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাবে। মাস্ক মন্তব্য করেছেন, কম্পিউটার সব সময় খেলায় জিতলেও মানুষ এখনো দাবা খেলতে পছন্দ করে। কিংবা বাগান করা মানুষের নিকট আনন্দদায়ক হতে পারে।
কিন্তু এই যুক্তি বেশ হালকা। উনিশ শতকের রাশিয়ান উপন্যাস না পড়ে থাকলেও যে কেউ জানে যে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বা অনাবশ্যক মনে হওয়া মানুষকে চরম মানসিক যন্ত্রণা ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়। অনেকে হয়তো বলবেন যে মাস্কের এই স্ববিরোধী কথা ও ঢালাও বক্তব্য নির্দেশ করে যে তিনি কোনো গুরুতর ব্যক্তি নন। তবে এটি ভেবে মিথ্যা সান্ত্বনা পাওয়া ভুল হবে। মাস্ক একজন জিনিয়াস, যিনি একই সাথে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ধারণা পোষণ করতে সক্ষম। স্পেসএক্স এর শেয়ার দীর্ঘমেয়াদে কিনতে চাওয়া বিনিয়োগকারীদের অবশ্যই একদিকে মাস্কের এআই সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস রাখতে হবে (যা তিনি আইপিও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে ব্যবহার করেছেন), আবার একই সঙ্গে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে টাকা জমানোর এখনো কোনো উদ্দেশ্য আছে। সর্বোপরি, মাস্কের বক্তব্য একটি চরম উদ্বেগজনক সত্য সামনে আনে। সর্বাধুনিক এআই তৈরির প্রতিযোগিতা যখন রকেটের গতিতে এগিয়ে চলছে, তখন এই সমাজকে প্রস্তুত করার চিন্তাভাবনা অনেক পেছনে পড়ে রয়েছে। এআইয়ের সঙ্গে অতি আধুনিক সমাজ কিভাবে মানিয়ে নিবে সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা যথেষ্ঠ ঘাটতি রয়েছে। মাস্কের এই নিয়ন্ত্রণহীন চরম হতাশা সংক্রমণ ঘটাতে পারে। অনেকের মতে এটি হয়তো তার উদ্দেশ্য সাধনেই সাহায্য করবে। কারণ তদারকি ছাড়া তিনি নিজের মতো প্রযুক্তি তৈরি করতে স্বাধীন থাকবেন। কিন্তু তা হতে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়।
