ইরানের স্কুলে ভয়াবহ মার্কিন হামলার হৃদয়বিদারক গল্প

শ্রেণিকক্ষ থেকে কবরস্থানে ১২০ শিশু

ইরানের স্কুলে ভয়াবহ মার্কিন হামলার হৃদয়বিদারক গল্প

ফন্ট সাইজ:

দক্ষিণ ইরানের ছোট শহর মিনাবের শাজারে তাইয়্যেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কয়েক মাস পরও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেদিনের বিভীষিকা ভুলতে পারছেন না শিক্ষক আমিনেহ নাদেমি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের এই হামলায় ১২০ শিশুসহ মোট ১৫৬ জন নিহত হয়েছেন। মিনাব প্রসিকিউটরের কার্যালয় হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেছে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের দাবি, বিদ্যালয়ের পাশের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একটি স্থাপনায় হামলা চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী স্কুলটিতে আঘাত হানে।
যদিও ওয়াশিংটন এ হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সামরিক তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা- পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যের কারণে ভুলবশত স্কুলটিকে সামরিক স্থাপনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় স্কুল
৩৩ বছর বয়সী শিক্ষক আমিনেহ নাদেমি বলেন, সেদিনও অন্য দিনের মতোই ক্লাস শুরু হয়েছিল। রমজান মাস হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রথমে নামাজকক্ষে কোরআন তিলাওয়াত করে। এরপর তিনি প্রথম শ্রেণির ছাত্রীদের ফারসি বর্ণমালার নতুন একটি অক্ষর শেখাতে শুরু করেন। ঠিক তখনই ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের প্রথম হামলা শুরু হয়।
স্কুল কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে এবং অভিভাবকদের সন্তানদের নিয়ে যেতে বলা হয়। আমিনেহ জানান, তার ১৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে তখন মাত্র পাঁচজন শ্রেণিকক্ষে ছিল। হঠাৎ একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর তিনি শিশুদের নিতে ফিরে যান।

তিনি বলেন, আমি বের হওয়ার ঠিক মুহূর্তেই একটি ক্ষেপণাস্ত্র স্কুলে আঘাত হানে। আমার মাথায় এবং শিশুদের মাথায় আঘাত লাগে। আমরা সবাই ছিটকে পড়ি।
এরপর পুরো শ্রেণিকক্ষ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। শ্বাস নেয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর পুরো ভবন ধসে পড়ে। আমার আর শিশুদের শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল, বলেন তিনি।
ধোঁয়া কিছুটা সরে গেলে আহত শিশুদের নিচে থাকা লোকজনের কাছে নামিয়ে দেন তিনি। পরে ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে স্কুলের ফটকে গিয়ে দেখেন, অসংখ্য অভিভাবক খালি পায়ে ছুটে এসেছেন। তখনও তিনি বুঝতে পারেননি যে অধিকাংশ মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন।

নিহতদের মধ্যে শিক্ষক ও বহু শিক্ষার্থী
ছয় বছর ধরে ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা আমিনেহ জানান, হামলায় তার প্রথম শ্রেণির ছাত্রী আদ্রিনা, দ্বিতীয় শ্রেণির ফাতেমেহ, ষষ্ঠ শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থী, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক এবং কোরআনের শিক্ষক নিহত হন।

উদ্ধারকর্মীদের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উদ্ধারকর্মী রেজা বাশারাতি বলেন, হামলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি জানান, আমরা ভেবেছিলাম হয়তো কাউকে জীবিত পাওয়া যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কাউকেই জীবিত পাইনি।

রেজার ভাষ্য, অনেক মরদেহ এতটাই বিকৃত ছিল যে শুধু হাত, পা বা শরীরের খণ্ডিত অংশ পাওয়া গেছে। অনেক পরিবার সন্তানদের জুতা বা পোশাক দেখে তাদের শনাক্ত করেছে।
তিনি বলেন, আমার এক আত্মীয় বারবার বলছিলেন, আমার ছেলেকে খুঁজে দাও। কিন্তু আমি বলতে পারিনি যে তার ছেলে আর বেঁচে নেই। আমরা সবাই কাঁদছিলাম।

তদন্তে কী উঠে এলো
হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রথমে এ ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং মার্কিন বাহিনী কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় না।

তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে যে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার পুরোনো তথ্যের কারণে স্কুলটিকে আইআরজিসির সামরিক স্থাপনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্কুলের পাশের আইআরজিসি কমপ্লেক্সে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। একই সঙ্গে স্যাটেলাইট চিত্রে স্কুল এবং পাশের কয়েকটি ভবনেও হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ঐতিহাসিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ২০১৬ সাল থেকে স্কুলটি আইআরজিসি কমপ্লেক্স থেকে আলাদা দেয়াল দিয়ে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং এর নিজস্ব প্রবেশপথ ও খেলার মাঠ ছিল। এছাড়া এটি একটি স্কুল- এ তথ্যও হামলার আগেই অনলাইনে প্রকাশ্যে ছিল।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, তদন্ত এখনও চলমান এবং এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

মোজা দেখে শনাক্ত করা হয় ৯ বছরের শিশুকে
ধ্বংসপ্রাপ্ত ওই বিদ্যালয় থেকে অল্প দূরেই রয়েছে কবরস্থান, যেখানে নিহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অনেককে দাফন করা হয়েছে। প্রতিদিন সেখানে যান মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি। তার নয় বছরের মেয়ে সেতায়েশ ওই হামলায় নিহত হয়।
তিনি বলেন, স্কুল বলে কিছুই আর ছিল না। চারদিকে শুধু ধোঁয়া, শিশুদের চুল, একদিকে হাত, অন্যদিকে পা পড়ে ছিল। সবাই টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল।

মাসুমেহ জানান, পরদিন ভোর পর্যন্ত মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে মেয়ের ক্রিম রঙের মোজা দেখে তার মরদেহ শনাক্ত করা হয়। তিনি বলেন, সেতায়েশ বড় হয়ে শিক্ষক হতে চেয়েছিল। সে ঘরে পুতুল সাজিয়ে বলত- ‘আমি তোমাদের শিক্ষক।’

শোকের সঙ্গে ক্ষোভ
এই হামলাকে ইরান সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বারবার তুলে ধরছে। এমনকি আলোচক বহনকারী একটি বিমানের নামও রাখা হয়েছিল ‘মিনাব-১৬৮’, যা নিহতের আগের সরকারি সংখ্যার প্রতি ইঙ্গিত।
স্থানীয়দের মতে, এ হামলা ইরানের মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এটি যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক ট্র্যাজেডিগুলোর একটি।
মেয়ের কবরের পাশে বসে মাসুমেহ বলেন, এই শিশুদের অপরাধ কী ছিল? তাদের হাতে কি অস্ত্র ছিল? তাদের হাতে ছিল শুধু পেন্সিল, বই, খাতা আর স্কুলব্যাগ। তারা যুদ্ধ করতে যায়নি, তারা শুধু শিখতে গিয়েছিল।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন