এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পোশাকশিল্পে এআই ও প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ

এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পোশাকশিল্পে এআই ও প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ

ফন্ট সাইজ:

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি (অটোমেশন), ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ এবং উচ্চ মূল্যসংযোজন পণ্য উৎপাদনে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আর শুধু কম উৎপাদন ব্যয় বা বাজারসুবিধার ওপর নির্ভর করবে না; বরং উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, টেকসই উন্নয়ন এবং মূল্যসংযোজনই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডার্স অ্যালায়েন্সের (বায়লা) আয়োজনে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী ‘বায়লা ফিউচার সামিট-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এবং কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর একটি। এ খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে দক্ষ, উদ্ভাবনী ও দায়িত্বশীল নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ে তোলা জরুরি। তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের চাহিদা পূরণে শ্রমশক্তিকে নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত (আপস্কিলিং) ও পুনঃপ্রশিক্ষিত (রিস্কিলিং) করা এখন সময়ের দাবি। সরকার শ্রমিক ও মালিক-উভয় পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে শিল্পবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। একই সঙ্গে টেকসই শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে নতুন নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু কম উৎপাদন ব্যয় বা বাজারসুবিধার ওপর নির্ভর করবে না; বরং দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। তিনি বলেন, অদূর ভবিষ্যতে এআই গ্রহণ ছাড়া কোনো পোশাক কারখানার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। যারা ডিজিটাল রূপান্তর গ্রহণ করবে, তারাই এগিয়ে থাকবে। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছেন। এখন সেই অবস্থান আরও শক্তিশালী করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি বিদিয়া অমৃত খান বলেন, শুধু ক্রেতাদের অর্ডার অনুযায়ী উৎপাদন করে আর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। উদ্ভাবন, নিজস্ব নকশা, ব্র্যান্ড উন্নয়ন ও মূল্যসংযোজনের দিকে যেতে হবে। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে এলডিসি–পরবর্তী বাণিজ্য বাস্তবতা, পরিবেশগত মানপালন এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তাই শুধু কম দামে প্রতিযোগিতা না করে ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য এবং পরিবেশ ও সামাজিক মানপালনের ব্যয় ভাগাভাগির দাবি তুলতে হবে।

বিদিয়া অমৃত খান বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এআই, অটোমেশন ও ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ এখন অপরিহার্য। কিন্তু দেশের অনেক কারখানায় এসব প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এখনো শুরু হয়নি। তিনি নিজস্ব ডিজাইন স্টুডিও, ফ্যাশন শিক্ষা ও দেশীয় ব্র্যান্ড গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন। পাশাপাশি শিল্পে নারীকর্মীর সংখ্যা বেশি হলেও নেতৃত্বের পর্যায়ে তাঁদের অংশগ্রহণ খুবই কম বলে উল্লেখ করেন।

উর্মি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফ বলেন, মজুরি বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়ায় উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান ও দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। ফলে অটোমেশন এখন আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এআই মানুষকে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং যারা এআই ব্যবহার করবে, তারা এআই ব্যবহার না করা মানুষকে প্রতিস্থাপন করবে।’ তিনি উৎপাদন পরিকল্পনা, কারখানা পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআই ব্যবহারের পাশাপাশি এআই–সমর্থিত সেলাইযন্ত্র ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে কারিগরি ও চিকিৎসাবিষয়ক বস্ত্রসহ উচ্চ মূল্যসংযোজন পণ্যে বৈচিত্র্য আনার আহ্বান জানান।

বায়লার সভাপতি আবরার হোসেন সায়েম বলেন, আগামী দিনের বৈশ্বিক বাজারে প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেল দিয়ে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, ‘থিংক বিয়ন্ড টুডে’ শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মানসিকতা। নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের দ্রুত এআই ও ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক ক্রেতা, নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোই এ সম্মেলনের লক্ষ্য। এলডিসি–পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সবুজ অর্থায়ন, আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা এবং ধারাবাহিক নীতিসহায়তা গুরুত্বপূর্ণ।

শেলটেক গ্রুপের পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, কোটা-পরবর্তী সময়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং কোভিড–১৯ মহামারির মতো চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। এখন নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতায় টিকে থাকতে অটোমেশন, এআই, দক্ষ জনবল এবং উচ্চ মূল্যসংযোজন পণ্যে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। তিনি বলেন, এলডিসি–পরবর্তী প্রস্তুতিতে বাজার বহুমুখীকরণ, মূল্যশৃঙ্খল উন্নয়ন, লজিস্টিকস শক্তিশালীকরণ, উৎপাদনের সময় কমানো, লিন ম্যানুফ্যাকচারিং এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে।

ইউরোপিয়ান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম)-এর চেয়ারম্যান নুরিয়া লোপেজ বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা এখনো শক্তিশালী। তবে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে টেকসই উৎপাদন, পরিবেশগত মানপালন ও পণ্যের বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা সবুজ কারখানা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছেন, যা আশাব্যঞ্জক।

‘ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ: ডিস্ট্রিবিউশন ও ভোক্তার অভিজ্ঞতার শক্তি’ শীর্ষক অধিবেশনে ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান বলেন, বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন শুধু পোশাক কেনেন না; তারা বাংলাদেশের কাছ থেকে মানপালন, টেকসই উৎপাদন, আস্থা, উদ্ভাবন এবং নির্ভরযোগ্যতাও কিনছেন। তিনি বলেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা প্রতিটি পণ্য যেন উৎকর্ষতার প্রতীক হয়, সে লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে।

সিমিন রহমান বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তি বা উৎপাদনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে না; বরং আজকের তরুণ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে দেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি। অনুষ্ঠানে বায়লার প্রথম সহসভাপতি হাসিন আরমান আয়ন স্বাগত বক্তব্য দেন।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন