মিয়ানমারের ক্ষমতাচ্যুত নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সুচি জীবিত আছেন কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তার ছেলে কিম অ্যারিস বিভিন্ন দেশের সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার কাছে সুচির ‘প্রুফ অব লাইফ’ বা তিনি জীবিত আছেন এমন প্রমাণ দাবি করা হয়। বিখ্যাত ম্যাগাজিন ইকোনমিস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন কথা বলা হয়। এতে আরও বলা হয়- সুচির সর্বশেষ সরকারি উপস্থিতি ছিল ২০২২ সালের শেষ দিকে। তখন তার বিরুদ্ধে চলা বিচার কার্যক্রম শেষ হয়।
এরপর থেকে তার আইনজীবীদেরও তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে কারাগারে তাকে দেখার দাবি উঠলেও সেসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সুচিকে কারাগারে পাঠানো হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে সামরিক জান্তা দাবি করে, তাকে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছে। তবে বিদেশি কূটনীতিকদের তাকে দেখতে দেয়া হয়নি। সামরিক জান্তা শুধু বলেছে, তিনি সুস্থ আছেন। কিন্তু এর বাইরে আর কোনো তথ্য দেয়নি।
প্রকাশিত একটি ছবিতে সুচিকে একজন পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেলেও ছবিটি সাম্প্রতিক কি না, তা নিশ্চিত নয়। তার ছেলে ছবিটির সত্যতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, যদি তার মা সত্যিই গৃহবন্দি থাকেন, তবে তা ইয়াঙ্গুনের বাড়িতে নয়। ন্যাপিডোর বাড়িটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে। মিয়ানমারের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং-এর সুচির বিষয়ে সঙ্গে সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ কথা বলেন। কূটনীতিকদের মতে, সুচির নাম উঠতেই মিন অং হ্লাইং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। কিছু কূটনীতিক আশঙ্কা করছেন, এই প্রতিক্রিয়া হয়তো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জান্তা সুচি জীবিত থাকার প্রমাণ দেখাতে পারছে না। তবে অন্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তার মৃত্যুর খবর এতদিন গোপন রাখা প্রায় অসম্ভব।
আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও সম্প্রতি সুচির শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তাকে মুক্তি দেয়া বা অন্তত কূটনীতিকদের তার সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হলে আসিয়ান ও জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক কিছুটা সহজ হতে পারে। অন্যদিকে, সুচিকে মুক্তি দিলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বড় প্রভাব পড়তে পারে। তিনি দীর্ঘদিন অহিংস আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বর্তমানে মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়াই করছে। কিছু কূটনীতিক মনে করেন, সুচির মুক্তি এই ঐক্যে ভাঙন ধরাতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক সরকার সশস্ত্র প্রতিরোধের চেয়ে সুচির নেতৃত্বে সম্ভাব্য অহিংস গণআন্দোলনকেই বেশি ভয় পায়। কারণ, দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বামার জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনও তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।
নিবন্ধটি আরও উল্লেখ করেছে, সুচির দুর্দশার দিকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ থাকলেও মিয়ানমারের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের সংকট যেন আড়ালে না পড়ে। মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে ১৪ হাজার ৫১৭ জনেরও বেশি রাজনৈতিক বন্দি আটক রয়েছেন। চলতি বছরই কারাগারে অন্তত ৬০ জন রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যু নিশ্চিত করেছে সংগঠনটি। সুচির ছেলে কিম অ্যারিসও বলেছেন, তার মা কখনোই চাইতেন না যে অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের দুর্ভোগ ভুলে যাওয়া হোক।
