লাভ কার লোকসান কার?

বি শ্ব কা প ২ ০ ২ ৬

লাভ কার লোকসান কার?

ফন্ট সাইজ:

চলতি বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। বেশি দেশ অংশ নেয়ায় এবং ম্যাচের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফুটবলপ্রেমীদের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে বিপুল অর্থ আয়ের সুযোগ। মাঠের ভেতরে ফুটবল তারকারা যখন নতুন ইতিহাস গড়ছেন, মাঠের বাইরে তখন কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য চলছে। তবে এই বিপুল অর্থপ্রবাহে সবাই লাভবান হতে পারেনি। চলতি এই বিশ্বকাপ থেকে কারা লাভবান এবং কাদের লোকসান হয়েছে তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। তারই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো।

আকাশচুম্বী আয় ফিফা’র: বিশ্বকাপ থেকে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা’র আয় রীতিমতো আকাশচুম্বী। কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ থেকে সংস্থাটি রেকর্ড ৭.৬ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। তিন দেশের যৌথ আয়োজনে এবারের আসরে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে ৪৮টি হওয়ায় আয় পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ডয়চে ব্যাংক রিসার্চের সিনিয়র স্ট্র্যাটেজিস্ট মারিওন ল্যাবুরে জানান, এবারের আসর থেকে ফিফা’র আয় প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে, তাই নিঃসন্দেহে ফিফাই এখানে সবচেয়ে বড় জয়ী। সমপ্রচার স্বত্ব, লাইসেন্সিং, হসপিটালিটি রাইটস, স্পন্সরশিপ ও টিকিট বিক্রি থেকে ফিফা এই অর্থ আয় করে। এ ছাড়া ফিফা টিকিট পুনর্বিক্রয়ের নিজস্ব সেকেন্ডারি মার্কেট চালু করে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ ফি নিচ্ছে। ভবিষ্যতে ফিফা টুর্নামেন্টের পরিধি আরও বাড়িয়ে ৬৪ দল করার কথা ভাবছে, যা চীন ও ভারতের মতো বিপুল দর্শকপ্রিয় বাজারকে যুক্ত করে আয় আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

পকেট কাটা গেছে ফুটবলপ্রেমীদের: সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য খেলা দেখার স্বপ্ন পূরণ করতে খরচ করতে হয়েছে চড়া মূল্য। তাদের জন্য আর্থিক দিক থেকে এই টুর্নামেন্ট অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়েছে। টিকিটের পেছনেই ভক্তদের বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়েছে। টিকিটের চাহিদা বাড়লে দাম বাড়িয়ে দেয়ার যে ডায়নামিক প্রাইসিং কৌশল ফিফা নিয়েছে, তা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও এক প্রশ্নের জবাবে স্বীকার করেছেন যে, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে নিজ দেশের উদ্বোধনী ম্যাচের জন্য ১,০০০ ডলার টিকিট মূল্য তিনি কখনো দিতেন না। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের টিকিটের অফিশিয়াল দাম ধরা হয়েছিল ৩২,৯৭০ ডলার, যেখানে পুনর্বিক্রয়ের বাজারে কিছু টিকিটের দাম ২০ লাখ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো অবশ্য এই চড়া দামের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বড় ক্রীড়া ইভেন্টের খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। টিকিট ছাড়াও বিমান ভাড়া, খাবার ও আবাসন খরচে ভক্তরা চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। নিউ জার্সি ট্রানজিট ট্রেনের ভাড়া সাধারণত ফিরতি যাত্রাসহ ১২.৯০ ডলার হলেও বিশ্বকাপের সময় তা বাড়িয়ে ১৫০ ডলার করা হয়েছিল, যা তীব্র প্রতিবাদের মুখে পরে কিছুটা কমানো হলেও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

বড় লাভবান সমপ্রচারক ও স্পন্সররা: খেলা সমপ্রচারের জন্য টিভি চ্যানেলগুলোকে বিপুল অর্থ গুনতে হলেও দর্শক সংখ্যা ও স্পন্সরদের প্রবল আগ্রহের কারণে বিজ্ঞাপন স্লট বিক্রি করে তারা বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নিচ্ছে। ফিফা এই বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের জন্য হাইড্রেশন ব্রেক বা পানি পানের বিরতি চালু করে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এটিকে পুরোপুরি খেলার ভেতরের বিষয় বললেও এই ৯০ সেকেন্ডের বিরতি সমপ্রচারকদের জন্য বিজ্ঞাপনের নতুন বাণিজ্যিক দুয়ার খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকরা খেলা চলাকালীন বিজ্ঞাপনের বিরতিতে অভ্যস্ত হওয়ায় এটি দারুণ কাজে দিয়েছে। ফক্স স্পোর্টস, যারা প্রায় ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারে যুক্তরাষ্ট্রের সমপ্রচার স্বত্ব কিনেছে, তারা এই বিরতিগুলোকে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের স্পন্সরশিপে প্রচার করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপের প্রতিটি ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন স্লটের মূল্য ২ লাখ থেকে ৩ লাখ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই হাইড্রেশন ব্রেকের বিজ্ঞাপন থেকে ২৫ কোটি ডলার উঠে আসতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের বিবিসি ও আইটিভির দর্শকরা এই বিজ্ঞাপন থেকে রক্ষা পেয়েছেন, কারণ বিবিসি কোনো বিজ্ঞাপন দেখায় না এবং আইটিভিও তাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মের কারণে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি বিজ্ঞাপন দিতে পারে না। পাশাপাশি অফিসিয়াল স্পন্সর যেমন অ্যাডিডাস ও কোকা-কোলা বিপুল অর্থ খরচ করে মাঠের চারপাশে নিজেদের ব্র্যান্ডিং ছড়িয়ে দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

ব্যক্তিগত মুনাফায় এগিয়ে ডেভিড বেকহ্যাম: অ্যাডিডাসের মূল বিজ্ঞাপনে সাবেক ফুটবল তারকা স্যার ডেভিড বেকহ্যামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রথম এই বিলিয়নেয়ার ক্রীড়াবিদ মাঠ থেকে বিদায় নিয়েছেন এক দশকেরও বেশি সময় আগে, তবুও তিনি এখনো যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের প্রধান মুখ। তার সহ-মালিকানাধীন মার্কিন ক্লাব ইন্টার মায়ামির বর্তমান বাজার মূল্য ধরা হয়েছে ১৪৫ কোটি ডলার, যা মেজর লিগ সকারের সবচেয়ে মূল্যবান ফ্র্যাঞ্চাইজি। মাঠের খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ না জিতলেও বাণিজ্যিক খেলায় তিনি নিশ্চিতভাবেই জয়ী হয়েছেন। বিশ্বকাপের ফলে তার ব্যক্তিগত ব্যান্ডিং যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে তার মুনাফা।

ক্ষতিতে স্বাগতিক শহরসমূহ: যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি স্বাগতিক শহর বিপুলসংখ্যক পর্যটক ও ফুটবলপ্রেমীদের স্বাগত জানালেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছেন। ফিফা অনুমান করেছিল যে বিশ্ব অর্থনীতিতে ৪,১০০ কোটি ডলার যোগ হবে, যার মধ্যে ১৭ বিলিয়ন ডলার শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই অবদান রাখবে এবং আবাসন খাতে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তবে অক্সফোর্ড গ্লোবাল প্রজেক্টসের প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার বুজিয়ার জানান, এমন বড় ক্রীড়া ইভেন্টের দীর্ঘমেয়াদি কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা বাস্তবে দেখা যায় না। উল্টো বিশ্বকাপের বিশৃঙ্খলা এড়াতে সাধারণ পর্যটকরা এসব শহর বর্জন করায় স্বাগতিক শহরগুলোতে পর্যটক আগমন কমে যায়। কর্মসংস্থান বাড়লেও তা মূলত কম বেতনের অস্থায়ী চাকরি। এ ছাড়া এই বিশ্বকাপে আগে থেকেই তৈরি স্টেডিয়াম, হোটেল ও পরিবহন অবকাঠামো ব্যবহার করায় নতুন কোনো বড় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে স্থায়ী অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার সুযোগ নেই।

আশানুরূপ লাভের মুখ দেখেনি হোটেল খাত: হোটেল রুমের যে বিপুল চাহিদার আশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। স্বাগতিক শহরগুলোর হোটেল বুকিং গত বছরের তুলনায় এবার বেশ কম। বৃটিশ কলাম্বিয়া হোটেল এসোসিয়েশন জানায়, ভ্যাঙ্কুভারে কানাডার ৭টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও জুন ও জুলাই মাসে হোটেল বুকিং আগের বছরগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল। টুর্নামেন্ট মানেই একটানা ৪০ দিন হোটেল হাউজফুল থাকা নয়, বরং খেলা সুনির্দিষ্ট ডেটগুলোতে সাময়িক চাহিদা তৈরি হয় মাত্র। আমেরিকার হোটেল ব্যবসায়ীরাও হতাশ হয়েছেন। আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং এসোসিয়েশন (এএইচএলএ) ফিফা’র বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে যে, তারা নিজেদের জন্য অতিরিক্ত রুম ব্লক করে রেখে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করেছিল, যদিও ফিফা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ডয়চে ব্যাংকের ল্যাবুরে জানান, ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপেও এমনটাই ঘটেছিল। এপ্রিলের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ৮০ শতাংশ হোটেল মালিক জানান যে, বুকিং তাদের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক কম ছিল, যার ফলে অনেকেই এই টুর্নামেন্টকে একটি গুরুত্বহীন ঘটনা হিসেবে দেখছেন।

রমরমা বাণিজ্য বেটিং কোম্পানির: ২০২৬ বিশ্বকাপ জুয়ার ইতিহাসের সর্ববৃহৎ আসরে পরিণত হয়েছে। আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাককুয়ারির তথ্যমতে, এবারের আসরে প্রায় ৫,০০০ কোটি ডলারের বাজি ধরা হতে পারে, যা প্রতি ম্যাচে গড়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলার। ২০২২ সালের ৬৪টি ম্যাচের তুলনায় এবার ম্যাচের সংখ্যা ১০০ পার হয়ে যাওয়ায় এই জুয়ার বাজার বড় হয়েছে। ফ্লুটার এন্টারটেইনমেন্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে জুয়া শিল্পের প্রসারের কারণে বাজির পরিমাণ গত আসরের চেয়ে দ্বিগুণ হবে। ম্যাককুয়ারির বিশ্লেষক চ্যাড বেনন জানান, ম্যাচ শুরুর আগের প্রথাগত বাজির চেয়ে এখন মাঠের খেলা দেখে সরাসরি লাইভ বাজি ধরার প্রবণতা অনেক বেড়েছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে স্পোর্টস বেটিং কেবল নেভাদায় বৈধ থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর অনেক অঙ্গরাজ্য এটিকে বৈধতা দিয়েছে। তবে ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাসের মতো কিছু জায়গায় এটি এখনো অবৈধ হওয়ায় যুবকদের মধ্যে প্রেডিকশন মার্কেট বা ভবিষ্যদ্বাণী করার বাজারের জনপ্রিয়তা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আইনিভাবে জুয়া হিসেবে গণ্য না হওয়ায় যেকোনো অঙ্গরাজ্য থেকেই ব্যবহার করা যাচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন