সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি ঘিরে নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি নাকচ করে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই সংবিধান সংশোধনের পথে এগোচ্ছে সরকার। এতে সংবিধান সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হচ্ছে। বিরোধী জোটের প্রতিনিধি ছাড়াই সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিশেষ কমিটির প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে ১১ দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্যরা। তারা এখন সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও আন্দোলন জোরদারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিকে সামনে রেখে তারা তৃণমূল পর্যন্ত কর্মসূচি বিস্তারের ঘোষণা দিয়েছে। বিরোধী দলের নেতারা বলছেন, বিশেষ কমিটির বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ কেবল সংসদে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংসদের পাশাপাশি মাঠেও আন্দোলন জোরদার করা হবে।
এদিকে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে বিশেষ কমিটি গঠনের সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গণভোটে জনগণ মৌলিক সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই রায় উপেক্ষা করে সরকার রাজনৈতিক প্রতারণার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধান সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। সরকার সেই সাংবিধানিক পথ অনুসরণ করে বিশেষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সংশোধনী বিল আনতে চায়।
অন্যদিকে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব প্রথম আসে গত ২৯শে এপ্রিল। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে বিরোধী দল থেকেও সদস্য রাখা হবে। কিন্তু বিরোধী দল শুরু থেকে বলে আসছে, গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আলাদা বিশেষ কমিটির প্রয়োজন নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়। ২০২৫ সালের ১৭ই অক্টোবর বিএনপি, জামায়াতসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল সনদে স্বাক্ষর করে। পরে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) সনদে স্বাক্ষর করে।
জুলাই সনদের ৮৪টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। এসব বাস্তবায়নের জন্য পরে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়। অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একইসঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে এবং সনদের বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে।
এসব বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মানবজমিনকে বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এগুলো সংসদে আনতে হবে এবং সংসদেই এর ফয়সালা করতে হবে। আর যদি সংসদে তা না হয়, তাহলে রাজপথে এর ফয়সালা হবে।
আন্দোলনের প্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি বলেন, সংসদেও আমাদের দাবি থাকবে, রাজপথেও আমরা দাবি অব্যাহত রাখবো। তিনি আরও বলেন, বিএনপি নেতৃবৃন্দ যদিও বলেন যে, তারা অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবেন, কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। যদি সত্যিই অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতেন, তাহলে বিরোধী দলকে অন্তত ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের পদ দেয়ার যে বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করতেন। এখানে বিএনপি’র কোনো দ্বিমতও ছিল না। যেসব বিষয়ে মতভেদ ছিল, সেগুলোতে আমরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি। কিন্তু এই বিষয়টিতে তো কোনো বিরোধ ছিল না। তাহলে এখন সেগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না কেন?
জামায়াতের কেন্দ্রীয় এই নেতা আরও বলেন, এর পরিণাম তাদের অবশ্যই ভোগ করতে হবে।
কারণ প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এখন যদি তারা সেই অবস্থান থেকে সরে যেতে চান বা অন্য কিছু করতে চান, তাহলে জনগণের কাঠগড়ায় তাদের দাঁড়াতে হবে। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই দাবি আদায় করবো।
এনসিপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার মানবজমিনকে বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আমরা ধারাবাহিকভাবে মাঠে আছি। এ কারণেই আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানাচ্ছি। সরকার যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক মনোভাব পোষণ করে, তাহলে জনগণের রায় ও আন্দোলনের দাবি মেনে নেবে। অন্যথায় আন্দোলনের মাধ্যমেই সরকারকে সেই রায় বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে। বর্তমান পরিস্থিতির সম্পূর্ণ দায় সরকারের। তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে নানা ধরনের ব্যাখ্যা দিচ্ছে, কিন্তু এতে কোনো লাভ হবে না। জনগণের রায় তারা মানছে না। এর ফলে যে পরিস্থিতিই সৃষ্টি হোক, তার দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।
