সাগরে নিখোঁজ ৫০০’র বেশি রোহিঙ্গা, কী ঘটেছে তাদের ভাগ্যে?

ফন্ট সাইজ:

গত ২৯শে জুন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে আনুমানিক ৫৩০ জন রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীকে নিয়ে দু’টি নৌকা রওনা দেয়। এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। একটি বিশাল যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে যত মানুষ ধরে, ঠিক ততসংখ্যক মানুষ যেন হঠাৎ করেই মহাশূন্যে মিলিয়ে গেছে। প্রবল বর্ষা শুরু হওয়া এবং সাগর উত্তাল থাকার কারণে নৌকা দু’টি উল্টে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। রেহিঙ্গাদের পরিবহনের জন্য সাধারণত পুরনো মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে যাত্রীবাহীতে রূপান্তর করে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ বোঝাই করা হয়। জরাজীর্ণ ইঞ্জিনবিশিষ্ট এই নৌকাগুলো সাগরে চলাচলের জন্য মোটেও উপযোগী ছিল না। নৌকা দু’টিতে থাকা মানুষদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ, যাদের অর্ধেকই ছিল নারী ও শিশু।

তবে তাদের ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছে তা নিশ্চিতভাবে জানা হয়তো আর কখনোই সম্ভব হবে না। রাখাইন রাজ্যে বহু বছর ধরে যুদ্ধ চলছে। বিদ্রোহী আরাকান আর্মি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে বেশির ভাগ এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তারা রাজ্যটির রাজধানী সিত্তওয়ে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। বর্তমানে সেখানে কেবল আকাশ ও সমুদ্রপথে যাতায়াত করা সম্ভব। দেশটির সামরিক বাহিনী রাখাইনের প্রায় সমস্ত টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষায় আন্দোলনরত আরাকান প্রজেক্টের প্রধান ক্রিস লেওয়া নৌকা দু’টির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি অত্যন্ত দুরূহ কাজ। সিত্তওয়ে বা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা সিন টেট ম ম নামের যে গ্রাম থেকে নৌকা দু’টি ছেড়েছিল, সেখানে যোগাযোগ করার মতো কোনো মাধ্যম এখন তার কাছে নেই। তবে অন্যান্য বিভিন্ন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, ২৯শে জুন দু’টি নৌকা ছেড়েছিল একটি সকালে এবং অন্যটি দিনের শেষভাগে। লেওয়া জানান, নৌকাগুলোর লক্ষ্য ছিল মিয়ানমারের দক্ষিণ উপকূলে পৌঁছানো এবং সেখানে যাত্রীদের খালাস করা।

সেখান থেকে বনের ভেতরের অস্থায়ী ট্রানজিট ক্যাম্প এবং থাইল্যান্ডের সড়ক পথ ব্যবহার করে তাদের মালয়েশিয়া সীমান্তে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সাধারণত যাত্রার এক সপ্তাহ বা ১০ দিনের মধ্যে পরিবারগুলো তাদের খোঁজ পেয়ে থাকে। তবে তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও এখনো কোনো খবর আসেনি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ সমুদ্রের তীরে ভেসে আসা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করেছে। এর ৯ দিন পর ইরাবতী ডেল্টা এবং মন রাজ্যের উপকূলের মধ্যবর্তী সাগরে কর্মরত জেলেরা আরও বেশ কয়েকটি মরদেহ খুঁজে পান। ক্রিস লেওয়া মনে করেন, সিন টেট ম ম গ্রাম থেকে ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা পর একটি নৌকা এবং দক্ষিণ-পূর্বদিকে কয়েকদিন চলার পর অন্য নৌকাটি ডুবে গেছে। এতে ৫০০ যাত্রীর অকাল মৃত্যুর সম্ভাবনাই অধিক। বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে বসবাস করছেন। সেখানে আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে আসছে, কাজের সুযোগ নেই এবং অপরাধী চক্রগুলো বেশ সক্রিয়। তাদের ক্যাম্পের বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। অন্যদিকে রাখাইন রাজ্যে এখনো প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গা রয়ে গেছেন। তাদের এক-চতুর্থাংশ অত্যন্ত শোচনীয় অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত ক্যাম্পে অবরুদ্ধ এবং বাকিরা যুদ্ধরত দুই পক্ষের মাঝখানে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা তাদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করছে। অপরদিকে রাখাইন জনগোষ্ঠীর সমর্থনপুষ্ট আরাকান আর্মিও রোহিঙ্গাদের বিশ্বাস করে না এবং তাদের বিরুদ্ধেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়াই রোহিঙ্গাদের একমাত্র ভরসা। মালয়েশিয়ায় ইতিমধ্যে ২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করায় সেটিই তাদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। এই সুযোগে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া জুড়ে মানব পাচারকারীদের একটি লাভজনক ব্যবসার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।

এই ব্যবসার ধরন অত্যন্ত সাধারণ নৌকায় গাদাগাদি করে মানুষ তোলা। এরপর কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছানো এবং প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে ৩,০০০ ডলার আদায় করা। যেসব পরিবার টাকা দিতে ব্যর্থ হয়, তাদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় এবং সেই নির্যাতনের ভিডিও স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে টাকা আদায়ের চাপ দেয়া হয়। বছরের পর বছর ধরে পাচারের পথ বদলালেও এই ব্যবসার নিষ্ঠুরতা বদলায়নি। ২০১৫ সালে থাইল্যান্ড সরকার মানব পাচারের দুর্নাম ঘোচাতে পাচারকারীদের সড়ক পথ বন্ধ করে দেয় এবং ম্যানগ্রোভ বন ও রাবার বাগানের ভেতরের ট্রানজিট ক্যাম্পগুলো গুঁড়িয়ে দেয়। সেসব ক্যাম্পে গণকবরের সন্ধান মেলার পর থাই সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয়। সেই বছর মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে দক্ষিণমুখী নৌকাগুলো থাইল্যান্ডের বদলে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের দিকে চলে যায়। আচেহর মৎস্যজীবী সমপ্রদায় প্রথমে এই নির্যাতিত মুসলিমদের স্বাগত জানালেও এখন সেই মনোভাব বদলে গেছে এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচার চলছে। মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী অত্যন্ত দক্ষ হওয়ায় রোহিঙ্গারা সরাসরি সমুদ্রপথে দেশটির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে না। নৌবাহিনী তাদের আবার খোলা সাগরে পুশব্যাক করে দেয়। এ কারণে পাচারকারীরা আবার থাইল্যান্ডকে প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। বড় মাদার শিপ বা মূল জাহাজগুলো রাখাইন বা বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূল থেকে রোহিঙ্গাদের তুলে নেয় এবং কর্তৃপক্ষের চোখ এড়াতে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। আজকাল তারা স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করে থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার পাচারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।

স্থানীয় জেলেদের টাকা দিয়ে রোহিঙ্গাদের থাইল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে বা সুমাত্রার সৈকতে নামানো হয় এবং পুরো টাকা পরিশোধের পর গোপনে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেয়া হয়। রাখাইন থেকে মিয়ানমারের অন্যান্য অংশে যাওয়ার সব স্থলপথ বন্ধ থাকায় তাদের পালানোর একমাত্র পথ এই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা। ক্রিস লেওয়ার হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০,০০০ রোহিঙ্গা নৌকাযোগে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ ছেড়েছেন। রাখাইন ও বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোর অসহনীয় পরিস্থিতির কারণেই বিগত বছরগুলোর তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য বৈধ পথ তৈরির আহ্বান জানালেও এই অঞ্চলের কোনো দেশই তাদের গ্রহণ করতে রাজি নয়।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন