নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী-রামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের উন্নয়ন কাজ চলছে। চারলেন সড়ক বর্ধিতকরণে অধিগ্রহণকৃত জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে নোয়াখালীর সড়ক ও জনপদ বিভাগ। তবে থেমে নেই দখলদারদের দৌরাত্ম্য। একদিকে চলছে উচ্ছেদ, আরেকদিকে দখল। অন্যদিকে, সওজ কর্তৃপক্ষ জমি সুরক্ষায় স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় বেপরোয়া দখলদাররা। ফলে নোয়াখালী-ঢাকা মহাসড়ক সংলগ্ন বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি অবৈধ দখলদারদের কব্জায়। অন্যদিকে, গত দুই-তিন বছর থেকে বন্ধ রয়েছে সওজের লিজ নবায়ন। ফলে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
সড়কের কাজ চলমান অবস্থায় গত ৯ই জুলাই রাতের আঁধারে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতা সওজের সোনাইমুড়ী বাজার সংলগ্ন শিমুলিয়া অংশের প্রায় ৩০০ ফুট জমি দখলে নেয়। এ বিষয়ে স্থানীয়রা দখলদারদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করলে উচ্ছেদ অভিযান চালায় প্রশাসন। দখলে অংশ নেয়া এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক হাজার টাকা মজুরিতে রাত ১২টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বে ৫০ জনের একটি দল দখলে অংশ নেয়।
গত ১১ই জুলাই মানববন্ধন থেকে সোনাইমুড়ী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা ইসমাইল মোল্লা, শিমুলিয়া ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সহ-সভাপতি ডা. শহীদ উল্লাহ, বাজারের ব্যবসায়ী নোমানসহ স্থানীয়রা জানায়, গভীর রাতে সোনাইমুড়ী পৌর বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন চেম্পু, উপজেলা বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক মনির ভূঁইয়া, পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল ভূঁইয়া, পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল ভূঁইয়া ও যুবদল নেতা মোজাম্মেল হোসেন অপুর নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে টিনের বেড়া দিয়ে কলেজ পুকুরপাড় থেকে শিমুলিয়া কালভার্ট পর্যন্ত প্রায় ৩০০ ফুট জায়গা দখল করে। পরে মানববন্ধন হলে স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান পরিচালিত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বৈধ লিজগ্রহীতারা জায়গা ছাড়লেও রাতের আঁধারেই সরকারি জমি দখল করছে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। সওজ কর্তৃপক্ষ জমি সুরক্ষায় স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় যেকোনো মুহূর্তে তা আবারো বেহাত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর আগে নোয়াখালী-ঢাকা মহাসড়কের নির্মাণ কাজের পর একইভাবে অবৈধ দখল হয় সওজের বিপুল সম্পত্তি। পূর্বের লিজগ্রহীতাদের পরিবর্তে সওজের জমি হাতিয়ে নিয়েছে অবৈধ দখলদাররা।
সরজমিন দেখা যায়, নোয়াখালী-ঢাকা মহাসড়কের সোনাইমুড়ী ইসলামগঞ্জ বাজারের প্রায় ৫০০ মিটার সওজের জমি অবৈধ দখল করে দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। মহাসড়ক সংলগ্ন বারাহিনগর গ্রামের প্রবেশ মুখ থেকে কাতার মসজিদ পর্যন্ত পুরোটাই অবৈধ দখল হয়ে আছে। এর মাঝে উদয়ন সমিতির নামে বনায়নের শর্তে জমি লিজ নিয়ে দেড়শ’ মিটার জমির উপরে টিনশেড ঘর তুলে দখল নেয়া হয়েছে। এদিকে, সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশের মহাসড়ক সংলগ্ন ৩০০ ফুট জমি অবৈধ দখল করে হোটেল-দোকানপাট গড়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া, সোনাইমুড়ীর বজরা থেকে চাষীরহাট পর্যন্ত সওজের বিপুল পরিমাণ জমি অবৈধ দখলে রয়েছে প্রভাবশালীদের। বজরা বাজারের উদয়ন সমিতির উপদেষ্টা নূর আলম জানান, সড়কের পাশে তাদের জমি থাকায় অ্যাপ্রোচ রোডের জন্য ও বনায়নের জন্য সওজ থেকে ৩০ বছরের লিজ নিয়েছেন। তবে বর্তমানে তাদের খাজনা বকেয়া রয়েছে। সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন সওজের জমিতে দখলে থাকা রোকন আলী মেম্বারের ছেলে মামুন জানান, তাদের দখলে পাঁচটি দোকান রয়েছে। মহাসড়ক হওয়ার আগে সওজ থেকে লিজ নেয়া ছিল। বর্তমানে লিজ নেই।
জানা যায়, প্রকল্পটি একনেক থেকে অনুমোদিত হয় ২০২৪ সালের ২৮শে মে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের ১লা জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত। প্যাকেজের আওতায় বেগমগঞ্জ-সোনাইমুড়ী-রামগঞ্জ সড়কের প্রশস্তকরণ, শক্তিশালীকরণ, শক্ত ফুটপাথ নির্মাণ, শক্ত কাঁধ, চারটি ভিন্ন আকারের আরসিসি বক্স, কালভার্ট, বাস-বে, পার্শ্ব সড়ক, সড়ক বিভাজনকারী, প্রতিরক্ষামূলক কাজ, সড়কের পাশের ড্রেন নির্মাণ করা হবে। এই কাজের লক্ষ্যে সওজ থেকে বিভিন্ন সময়ে লিজ নেয়া জমিতে নির্মিত দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদের আওতায় আসে। তবে নোয়াখালী-ঢাকা মহাসড়ক সংলগ্ন অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি নোয়াখালী সড়ক ও জনপদ বিভাগ। এ বিষয়ে কথা বলতে নোয়াখালী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তা রিসিভ হয়নি।
পরে সওজের সোনাইমুড়ী সড়ক শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবদুর রহিম মানবজমিনকে জানান, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিন মন্ত্রণালয়ে মিটিংয়ে রয়েছেন। সম্প্রতি দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে অভিযান চলছে। দখল করলেই উচ্ছেদ করা হবে। ভবিষ্যতে সওজের জমি দখলমুক্ত রাখতে সীমানা পিলার দেয়া হবে। তবে উপজেলার ইসলামগঞ্জ বাজার থেকে পোরকরা পর্যন্ত অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি অবগত নন বলে জানান। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে অনুরোধ করেন।
