গাইবান্ধার সুজাউদ্দৌলা সরকার সুজা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে নিজ এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব গড়েছিলেন। জুলাই বিপ্লবের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে প্রাণভয়ে পালিয়েছিলেন এলাকা ছেড়ে। পরে ২০২৪ সালে আগস্টে ওমরাহ ভিসায় মক্কায় পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানেও অপরাধ ছাড়তে পারেনি। পবিত্র কাবা শরীফের চত্বরে ওমরাহকারীদের পকেট কাটতে শুরু করেন। সেখানে গিয়ে যখন বুঝতে পারলেন হাজিদের পকেটকাটা সহজ তখন সুজা, দেশে থাকা আরও চার পকেটমার বন্ধুদের ফোন করে সৌদি নিয়ে যায়। পরে দলবলসহ পকেটকাটা শুরু করেন এবং একপর্যায়ে মক্কার মাটিতে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় দলসহ।
এই চক্রের অন্যতম খলনায়ক সুজাউদ্দৌলা সরকার সুজা গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কুখ্যাত সাঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন সুইটের আপন ভাই।
দলের অন্যরা হলো- জামালপুর পৌরসভার উত্তর কাচারীপাড়ার জাহাঙ্গীর চৌধুরীর ছেলে জাকির হোসেন ইমন চৌধুরী, লিটন মিয়া, মুহাম্মদ সোহেল রানা ও মাসুদ। এই তিনজনের সঠিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে এরা সুজার পকেটকাটা বাহিনীর সদস্য বলে জানা গেছে। দীর্ঘ দুই বছর সৌদি আরবে জেল খেটে ইতিমধ্যে গোপনে দেশে ফিরেছে এই তিনজন। তবে চক্রের অন্যতম খলনায়ক সুজা সৌদি আরবের সফর জেলে (ডিপোর্টেশন সেন্টার) দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। পাসপোর্ট জটিলতায় তার ফেরা আটকে থাকলেও, দেশে ফিরলেই বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হতে পারে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। বিশ্বস্ত সূত্র আসামিদের দেশে ফেরার তথ্য এবং সুজার ফেরার অপেক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সুজার ভাই সুইট চেয়ারম্যানও সুজার দেশে ফেরার প্রস্তুতির বিষয়টি মানবজমিনকে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সিন্ডিকেটের মূলহোতা জাকির হোসেন ইমন চৌধুরীর বিরুদ্ধে সৌদি শরীয়াহ আইন অনুযায়ী হাত কাটার চূড়ান্ত রায় কার্যকর হতে পারে। মক্কার ফৌজদারি আদালতের নথিপত্র এবং পুলিশের ডকেট ঘেঁটে জানা যায়, উল্লিখিত ৫ পকেটমার পবিত্র হারাম শরীফের ভেতরে সুকৌশলে কৃত্রিম ভিড় তৈরি করে পকেটমারি কারবার শুরু করেছিল। তাদের অভ্যন্তরীণ চুক্তি অনুযায়ী, ইমন চৌধুরী ও লিটন মিয়া পেতো চুরির ৩০ শতাংশ এবং বাকি ৪০ শতাংশ টাকা চক্রের অন্য তিন সহযোগীর মধ্যে ভাগ হতো।
আদালতের চার্জশিট ও আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী জানা যায়, পকেটমার ইমন চৌধুরীর কাজ ছিল লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে সরাসরি কোমর বা বেল্ট থেকে মানিব্যাগ গায়েব করা। কাবা চত্বরের এক অপারেশনে সে আজমত খান গুলাব নামের এক পাকিস্তানি নাগরিকের বেল্ট কেটে ১২০০ সৌদি রিয়াল, রেসিডেন্স পারমিট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স হাতিয়ে নেয়। তার প্রধান সহযোগী হিসেবে লিটন মিয়া সরাসরি পকেটমারিতে অংশ নিতো এবং মেরাজ শেখ নামের এক বাংলাদেশি হাজির কোমর থেকে ২০০ সৌদি রিয়াল ও আমিরাতি দিরহামসহ একটি মানিব্যাগ হাতিয়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ইমনের কাছে পার করে দেয়। পকেটমারির মূল অপারেশনের সময় মুহাম্মদ সোহেল রানা কভার ম্যান হিসেবে কাজ করতো, যার দায়িত্ব ছিল ইমন ও লিটনকে আড়াল করে রাখা এবং পেছন থেকে নজর রাখা যাতে কেউ হাতেনাতে ধরতে না পারে। অন্যদিকে মাসুদ ভূঁইয়া ছিল ভিড় সৃষ্টিকারী হিসেবে হাজিদের চারপাশ থেকে ঘিরে রাখতো। সেইসঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করা এবং কৃত্রিম ভিড় তৈরি করে ভিকটিমদের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতো। আর সুজা থাকতো নিরাপত্তা প্রাচীর বা শিল্ডম্যানের ভূমিকায়।
সে সহযোগীদের সঙ্গে মিলে ভিকটিমদের এমনভাবে অবরুদ্ধ করে রাখত যাতে চুরির পর ভিকটিম কোনোভাবেই জটলা থেকে বের হতে বা অপরাধীদের পিছু নিতে না পারে।
আদালতের নির্দেশনায় মক্কার মিসফালাহ সড়ক এলাকার একটি ৬ তলা ভবনের আস্তানায় ঝটিকা অভিযান চালায় সৌদি পুলিশ। সেখানে একটি ছোট ফ্রিজের পেছন থেকে উদ্ধার হয় একটি ব্যাগ। সেই ব্যাগে পাওয়া যায় নগদ ৬০০ মার্কিন ডলার, ২৬৬৭ সৌদি রিয়াল, ১২ হাজার বাংলাদেশি টাকা, ৫৭ আমিরাতি দিরহাম, সিঙ্গাপুরের মুদ্রা এবং বিভিন্ন মডেলের চুরিকৃত দামি মোবাইল ফোন।
প্রায় দুই বছর সৌদি জেলে থাকার পর তিনজন দেশে ফিরেছে। ইমনের দেশে ফেরা এখনো নিশ্চিত না হলেও সুজার জামিন হয়েছে। যেকোনো দিন দেশে ফিরবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুজা গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম জাহাঙ্গীর কবিরের ওপর বর্বরোচিত হামলার মামলায় একজন ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকলে বিমানবন্দরে পা রাখামাত্রই গ্রেপ্তার হতে পারেন সুজা। তবে আইনি জটিলতা এড়াতে সুজা সর্বোচ্চ গোপনীয়তা অবলম্বন করে দেশে নামার চেষ্টা করবে বলেও জানা গেছে।
