অকার্যকর তালাকের অজুহাতে ভরণপোষণ-দেনমোহর এড়ানো যাবে না: হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়

অকার্যকর তালাকের অজুহাতে ভরণপোষণ-দেনমোহর এড়ানো যাবে না: হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়

ফন্ট সাইজ:

আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহরের ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না বলে যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ মা-বাবার তালাকসংক্রান্ত বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়, এটি শিশুর একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। সম্প্রতি বিচারপতি আবদুর রহমানের একক বেঞ্চের দেয়া এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।

এই মামলায় আদালতে স্বামীর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শহিদুল ইসলাম। স্ত্রীর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান ও ইফাত হাসান শাম্মি। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, এই রায় পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালত স্পষ্ট করেছেন, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী বা নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ এড়ানো যাবে না। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন আইনগত অধিকার এবং বিবাহ, তালাক ও ভরণপোষণসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একচ্ছত্র এখতিয়ার ফ্যামিলি কোর্টের। তার মতে, নারী ও শিশুর অধিকার সুরক্ষা এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

মামলার পটভূমি: মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে পক্ষদ্বয়ের বিয়ে হয়। পরবর্তীতে স্ত্রী ও তাদের নাবালক কন্যা সন্তানের পক্ষে দেনমোহর এবং ভরণপোষণের দাবিতে ফ্যামিলি কোর্টে মামলা করা হয়। স্বামী দাবি করেন, তিনি এর আগেই স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। তবে আদালতে তিনি আইন অনুযায়ী সেই তালাক প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন। ফলে ফ্যামিলি কোর্ট স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি প্রদান করেন। পরবর্তীতে স্বামী নতুন একটি ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করে দাবি করেন যে তালাক কার্যকর হয়েছে। সেই মামলার অজুহাতে তিনি ভরণপোষণ ও দেনমোহরের ডিক্রির এক্সিকিউশন (বাস্তবায়ন) স্থগিতের আবেদন করেন। নিম্ন আদালত আবেদনটি খারিজ করলে তিনি হাইকোর্টে রিট করেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ: রায়ে হাইকোর্ট বলেন, শুধুমাত্র নতুন একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে—এ কারণে পূর্বে প্রদত্ত চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। কোনো সক্ষম আদালত ডিক্রি স্থগিত না করা পর্যন্ত তা কার্যকর থাকবে এবং এক্সিকিউশন কোর্ট সেই ডিক্রি বাস্তবায়নে বাধ্য। আদালত আরও বলেন, যে তালাক আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় বা কার্যকর নয়, তার কোনো আইনগত কার্যকারিতা নেই। এমন তালাক বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটায় না এবং দেনমোহর বা ভরণপোষণের ডিক্রি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কোনো আইনি বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। রায়ে আদালত স্পষ্ট করেন, বিবাহ, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং বৈবাহিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র এখতিয়ার ফ্যামিলি কোর্টের।
রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ। হাইকোর্ট বলেন, একজন নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের অধিকার একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। মা-বাবার মধ্যে তালাক নিয়ে বিরোধ থাকলেও সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না। কোনো পিতা তালাকসংক্রান্ত বিরোধের অজুহাতে সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। এ ছাড়া আদালত বলেন, এক্সিকিউশন কোর্টের দায়িত্ব কেবল বিদ্যমান ডিক্রি বাস্তবায়ন করা। তারা নতুন করে তালাক বৈধ কি না বা বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান কি না—এসব বিষয়ে বিচার করতে পারে না। ডিক্রির বাইরে গিয়ে নতুন বিরোধ নিষ্পত্তিরও তাদের কোনো এখতিয়ার নেই।

রায়ে আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, যদি পূর্বে দাবি করা তালাক আইনগতভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয় এবং স্বামী সত্যিই বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটাতে চান, তাহলে তিনি আইন অনুযায়ী নতুন করে তালাক দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে সেই সম্ভাবনা পূর্বে প্রদত্ত ডিক্রির অধীনে সৃষ্ট দেনমোহর ও ভরণপোষণের দায় থেকে তাঁকে মুক্তি দেবে না। হাইকোর্ট রুল খারিজ করে নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন। একই সঙ্গে স্বামীকে দেনমোহরের বকেয়া এবং স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের সব বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দেন।

এই রায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে আরও সুদৃঢ় করেছে। প্রথমত আইনগতভাবে কার্যকর হতে হলে তালাক অবশ্যই আইন অনুযায়ী প্রমাণিত হতে হবে। দ্বিতৃয়ত, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। তৃতীয়ত নতুন মামলা দায়ের করে কোনো চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। ফলে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং নারী ও শিশুর আইনগত অধিকার সুরক্ষায় এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন