ইসরাইলি ‘পেগাসাস’ ব্যাপক ব্যবহার করেছে মরক্কো

স্পেনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ

ইসরাইলি ‘পেগাসাস’ ব্যাপক ব্যবহার করেছে মরক্কো

ফন্ট সাইজ:

আফ্রিকার দেশ মরক্কো স্পাইওয়্যার পেগাসাস এর ব্যাপক ব্যবহার করেছে। সম্প্রতি দেশটিতে একাধিক সংবাদপত্রের যৌথ অনুসন্ধানে এমনটাই উঠে এসেছে। মরক্কোর অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএসটি) একজন প্রাক্তন সদস্যের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, ফরাসি রাজনীতিবিদ, স্পেনের ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে পেগাসাস স্পাইওয়্যার ব্যবহারের এই চাঞ্চল্যকর চিত্র সামনে আসে। ইসরাইল ভিত্তিক এনএসও গ্রুপের তৈরি হ্যাকিং সফটওয়্যার পেগাসাস। এটি দিয়ে টার্গেট করা ব্যক্তির মোবাইল ফোনের সমস্ত ইমেইল, মেসেজ, ছবি এবং অবস্থান তো জানাই যায়, এমনকি দূর থেকে ফোনের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন সচল করে একে গোপন আড়িপাতার যন্ত্রেও রূপান্তর করা সম্ভব। যদিও এনএসও গ্রুপ সবসময় দাবি করে যে তারা কেবল অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের দমনে এই প্রযুক্তি বিভিন্ন দেশের বৈধ সরকারের কাছে বিক্রি করে।

তবে ভিন্নমতাবলম্বী ও কূটনীতিবিদদের ওপর অবৈধ নজরদারিতে এর ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ডিজিএসটিতে কর্মরত ‘সাফির’ ছদ্মনামের এক হুইসেলব্লোয়ারের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, মরক্কোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী ২০১৭ সাল থেকে দীর্ঘ চার বছর ধরে দেশী-বিদেশী অসংখ্য ব্যক্তিকে টার্গেট করে পেগাসাস ব্যবহার শুরু করে। মরক্কোর সাংবাদিক হিশাম মনসুরির অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে ফর্বিডেন স্টোরিজের সমন্বয়ে গঠিত ১৪টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একটি কনসোর্টিয়াম এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সিকিউরিটি ল্যাব যৌথভাবে এই দীর্ঘমেয়াদী তদন্ত চালায়। ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশটির রাজধানী রাবাতের একটি বিলাসবহুল ভিলায় মরক্কোর উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সামনে পেগাসাসের এই রিমোট-ইনফেকশন ক্ষমতার লাইভ ডেমো দেয়া হয়েছিল। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই স্পাইওয়্যারটি সংযুক্ত আরব আমিরাত মরক্কোকে উপহার হিসেবে দিয়েছিল বলে জানা যায়।

সাফির জানান, এটি ছিল অনেকটা নেটফ্লিক্স সাবস্ক্রিপশনের মতো। এক বন্ধু টাকা দিয়ে অ্যাকাউন্ট কিনে বাকি বন্ধু দেশগুলোকে ব্যবহারের সুযোগ দেয়। পেগাসাস প্রজেক্টের নথিতে দেখা গেছে, মরক্কো কর্তৃক পেগাসাসের মাধ্যমে টার্গেট করা তালিকার মধ্যে স্পেনের ২০০টিরও বেশি মোবাইল নম্বর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২২ সালের মে মাসে স্পেন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে যে, ২০২১ সালের মে ও জুন মাসে তাদের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মারগারিটা রোবলসের মোবাইল ফোন পেগাসাস স্পাইওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। এছাড়া স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা এবং কৃষিমন্ত্রী লুইস প্লানাসের ফোনও টার্গেট করা হয়। তৎকালীন সময়ে পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক সংগঠন পোলিসারিও ফ্রন্টের এক নেতাকে স্পেনে চিকিৎসার অনুমতি দেয়া নিয়ে মাদ্রিদ ও রাবাতের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল, যার সূত্র ধরেই এই হ্যাকিং চালানো হয়। ফাঁস হওয়া নথি ও আলোকচিত্র থেকে আরও জানা যায়, মরক্কোর এই গোয়েন্দা সংস্থাটি স্পেনের বিশেষ পুলিশ বাহিনী ‘গুয়ার্দিয়া সিভিল’-এর কর্মকর্তাদের যোগাযোগের ওপর নজরদারির চেষ্টা করে। তারা মূলত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য মরক্কো সফরে গিয়েছিলেন।

এই বাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নম্বর পেগাসাস নজরদারির তালিকায় পাঁচবার পাওয়া গেছে। বিষয়টি সামনে আসার পর স্পেনের নিরাপত্তা বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা একে চরম ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ তারা মরক্কোকে মিত্র মনে করে বাড়তি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেননি। ২০১৮ সালে এনএসও গ্রুপের মূল কোম্পানির এক গোপন বোর্ডিং প্রেজেন্টেশনে পেগাসাস ব্যবহারকারী দেশগুলোর কার-ম্যানুফ্যাকচারার কোডনামে মরক্কোকে ‘মরগান’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মাধ্যমেই মরক্কোর স্পাইওয়্যার ব্যবহারের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হয়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন