যুক্তরাষ্ট্র রাতভর ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। এই হামলা থেকে রেহাই পায়নি হাসপাতাল। শহীদ বাঘাই হাসপাতাল হামলায় শিশু ক্যান্সার বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর পুনরায় অবরোধ জোরদার করেছে। এর জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসন বন্ধ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, সিরিক, চাবাহার, কোনারাক, রাস্ক সিটি, খন্দাব এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় খোররমাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এ ছাড়া আহভাজ শহরেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, মার্কিন বোমাবর্ষণে শহীদ বাঘাই হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে হাসপাতালের শিশু ক্যানসার চিকিৎসা বিভাগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কেমোথেরাপিসহ ক্যানসার চিকিৎসা দেয়া হতো এমন এই হাসপাতাল থেকে শিশু রোগীসহ সব রোগীকে সরিয়ে নিতে হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, মার্কিন হামলায় একটি সেনা ব্যারাকেও আঘাত হানা হয়েছে। এতে অন্তত সাত সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন এবং দেশজুড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। তেহরানের হিসাবে, এ পর্যন্ত নতুন করে মার্কিন হামলায় কমপক্ষে ৩৫ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানে শত্রু হুমকি মোকাবিলায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। এর আগে কেশম ও বন্দর ইমাম খোমেইনিসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর আসে। পরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, ইরানের একমাত্র বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে বুশেহরে। সেখানেও নতুন করে মার্কিন হামলা হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলকারী জাহাজের জন্য হুমকি তৈরি করছিল- এমন ইরানি সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, ইরানের বন্দর অবরোধ ভেঙে প্রবেশের চেষ্টা করা একটি খালি তেলবাহী জাহাজকেও তারা অচল করে দিয়েছে। সেন্টকম জানায়, কুরাসাও’র পতাকাবাহী এমটি বেলমা নামের জাহাজটির ধোঁয়ার চিমনিতে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এক্সে দেয়া এক পোস্টে তারা লিখেছে, জাহাজটি আর ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে না।
ইরানের পাল্টা জবাব
জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। হামলার সময় বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজে। একই সময়ে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আন্দিমেশক শহরের আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে বলা হয়েছে, আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনীর পরিচালিত নতুন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরাকের কুর্দি বাহিনী জানিয়েছে, ইরবিল শহরের আকাশে বিস্ফোরকবোঝাই আটটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট। এএফপির সাংবাদিকরা বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন এবং মার্কিন কনস্যুলেটের কাছে ধোঁয়া উঠতে দেখেছেন। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরব ও কুয়েতকে নতুন অস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরবের কাছে প্রায় ১৯৬ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির সম্ভাব্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া কুয়েতের জন্য ৪৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের একটি সামরিক বিমান রক্ষণাবেক্ষণ প্যাকেজও অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরবের জন্য প্রস্তাবিত চুক্তিতে সর্বোচ্চ ২০ হাজার অ্যাডভান্সড প্রিসিশন কিল উইপন সিস্টেম-এর গাইডেন্স ইউনিট, ওয়ারহেড, লঞ্চার, প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ ও লজিস্টিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কুয়েতের প্যাকেজে রয়েছে সি-১৭ পরিবহন বিমানের যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং লজিস্টিক সেবা। চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রস্তাব দুটি মার্কিন কংগ্রেসে পর্যালোচনার জন্য যাবে।
আরও হামলার ইঙ্গিত ট্রাম্পের
২৪ ঘণ্টার মধ্যে তৃতীয় দফা হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান শান্তি চুক্তি করতে প্রস্তুত। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। পেনসিলভেনিয়ায় ইউএস আর্মি ওয়ার কলেজে আয়োজিত এক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, তারা আমাদের পদক্ষেপ পছন্দ করছে না, আর তারা সমঝোতা করতে চায়। দেখা যাক, আমরা সমঝোতায় পৌঁছাই, নাকি বিষয়টির একেবারে শেষ করে দিই। পরে ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তেহরান আলোচনার টেবিলে না ফিরলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে। তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহ তাদের জন্য খুবই ভয়াবহ হবে।
আলোচনা এখনো পুরোপুরি ভেঙে যায়নি
নতুন করে সংঘাত শুরু হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার মধ্যস্থতাকারী আলোচনার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়নি। তবে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, সমঝোতা স্মারকের ধারাগুলো কার্যকর থাকলেই কেবল তার অর্থ থাকে। তিনি আরও বলেন, ইরান যদি এই সমঝোতা থেকে কোনো সুবিধা না পায়, তাহলে তা মেনে চলারও কোনো কারণ নেই। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে ইরান ২০২৪ সাল থেকে আটক থাকা এক মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। মানবাধিকার আইনজীবী জ্যারেড গেনসার জানান, গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন সংকট
বর্তমান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে। কয়েক মাস ধরে এই নৌপথকে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার পর অল্প সময়ের জন্য প্রণালি খুলে দেয়া হলেও গত সপ্তাহে ইরান আবার ঘোষণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসন বন্ধ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, মঙ্গলবার এই নৌপথ দিয়ে মাত্র ২১টি জাহাজ চলাচল করেছে। নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়েছে এবং তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় অবরোধ কার্যকর করেছে, যার অংশ হিসেবে এমটি বেলমা জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন অবরোধ এক অর্থে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারককে কার্যত অকার্যকর করে দিয়েছে।
