আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন গণকবরে দাফন করা শহীদদের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষাসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তদন্ত চালানো হচ্ছে। নতুন নতুন গণকবর, হাসপাতাল এবং অন্যান্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসব তদন্তের ভিত্তিতে জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ৪০০ শহীদের সংখ্যাও আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বুধবার রাজধানীর রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান-সংলগ্ন জুলাই শহীদদের গণকবর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা সব গণকবর পরিদর্শন করা হবে। প্রতিটি গণকবরে দাফন হওয়া শহীদদের পরিচয় শনাক্তে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা কাজ করছে। ইতোমধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কয়েকটি প্রতিবেদনে কিছু শহীদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে শুধু গণকবর নয়, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকেও তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের কাজ চলছে। তিনি আরও জানান, তদন্তে এমন তথ্য পাওয়া গেছে যে, কয়েকটি হাসপাতালে নিহতদের নাম রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হতো না। অনেককে ‘বেওয়ারিশ’ মরদেহ হিসেবে দাফন করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সুরতহাল ও ময়নাতদন্তও করতে দেওয়া হয়নি। এসব ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্তে জানা গেছে, ঢাকার একটি হাসপাতাল থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত অনেকের মরদেহ পাশের একটি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কোন হাসপাতালটি জড়িত, তদন্তের স্বার্থে আপাতত তার নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে ওই হাসপাতালের তৎকালীন কর্তৃপক্ষসহ এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষ হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের কাজও চলছে। ডিএনএ পরীক্ষাসহ আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, রায়েরবাজারের গণকবরে মোট ১১৪টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৮ জন জুলাই শহীদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর জানান, রায়েরবাজার ছাড়াও জুরাইন, মাতুয়াইল, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের গণকবর পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন করা হবে। এসব স্থান থেকেও নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষাসহ অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শহীদদের পরিচয় নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন গণকবর, বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য এবং নদীতে ভাসিয়ে দেয়া মরদেহ শনাক্ত হলে শহীদের প্রকৃত সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, এখন পর্যন্ত ৮৩৪ জন জুলাই শহীদের মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিটি শহীদের পরিচয় নিশ্চিত করে তাদের পরিবারের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেয়া এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করাই তদন্ত সংস্থার প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, আমরা চাই, প্রতিটি শহীদের পরিচয় নিশ্চিত হোক এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কোনো অপরাধী যেন বিচারের বাইরে থাকতে না পারে।
