ফ্রান্সে পাস হতে যাচ্ছে স্বেচ্ছামৃত্যু বিল। জীবনাবসান সংক্রান্ত চিকিৎসা বা ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’ নিয়ে দীর্ঘ কয়েক বছরের বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে বুধবার ফ্রান্সের নিম্নকক্ষ বা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি এ সংক্রান্ত বিলের চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে যাচ্ছে। এ আইনের ফলে দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা কঠোর নিয়মের অধীনে নিজেদের জীবনাবসানের জন্য প্রাণঘাতী ওষুধ গ্রহণের আইনি অধিকার পাবেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। তিন বছরেরও বেশি সময় আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন এই আইনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। নিম্নকক্ষে এর আগে তিনবার বিলটি পাস হওয়ায় এবারও এর চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। রক্ষণশীলদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা উচ্চকক্ষ বা সিনেট অবশ্য বিলটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে ফ্রান্সের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া অনুযায়ী, দুই কক্ষের মধ্যে দ্বিমত থাকলে নিম্নকক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। অবশ্য সিনেট প্রেসিডেন্ট জেরার্ড লার্চার জানিয়েছেন, বিলটি পাসের পর তিনি তা ‘কনস্টিটিউশনাল কাউন্সিল’-এ পাঠাবেন, যা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কি না তা যাচাই করতে এক মাস পর্যন্ত সময় নিতে পারে।
এই প্রক্রিয়া শেষেই আইনটি কার্যকর হবে। এই আইনের আওতায় সুবিধা পেতে হলে আবেদনকারীকে অবশ্যই কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সী এবং ফ্রান্সের নাগরিক বা দেশটির আইনি বাসিন্দা হতে হবে। রোগীকে এমন কোনো গুরুতর ও দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে হবে যা তাঁর জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি এবং রোগটি এমন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে যেখানে তাঁর শারীরিক কষ্ট অসহনীয় ও কোনো চিকিৎসায় উপশমযোগ্য নয়। তবে কেবল মানসিক কষ্ট বা বিষন্নতার কারণে এই আবেদন করা যাবে না। তীব্র মানসিক ব্যাধি বা আলঝেইমারের মতো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও এই আইনের আওতাভুক্ত হবেন না। পুরো প্রক্রিয়াটিতে রোগীকে সম্পূর্ণ নিজস্ব স্বাধীন ইচ্ছায় আবেদন করতে হবে। স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের একটি দল ১৫ দিনের মধ্যে আবেদনটি পর্যালোচনা করবে এবং অনুমোদনের পর রোগীকে অন্তত দুই দিন এটি পুনর্বিবেচনা বা ভাবার সময় দেওয়া হবে।
এটি মূলত চিকিৎসকের সহায়তায় আত্মহত্যা, যেখানে রোগী নিজেই প্রাণঘাতী ওষুধ গ্রহণ করবেন। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা যদি ওষুধ নিজে গ্রহণে অক্ষম হয়, কেবল তখনই ডাক্তার বা নার্স তাকে এটি সেবনে সরাসরি সহায়তা করতে পারবেন। অনুমোদন পাওয়ার পর রোগী তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী বাড়ি অথবা চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রিয়জনদের উপস্থিতিতে যেকোনো সময় এই ওষুধ গ্রহণ করতে পারবেন। ওষুধ গ্রহণের চূড়ান্ত মুহূর্তেও ডাক্তার বা নার্স রোগীর সম্মতি পুনরায় যাচাই করবেন এবং কোনো জটিলতা এড়াতে কাছাকাছি অবস্থান করবেন। এই প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ খরচ ফ্রান্সের জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা বহন করবে। ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের অধিকাংশ মানুষ এই জীবনাবসান আইনের পক্ষে এবং বিগত দুই দশকে এর পক্ষে জনসমর্থন আরও বেড়েছে। ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য রাইট টু ডাই উইথ ডিগনিটি’ এই বিলকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি মানুষকে অসহনীয় কষ্ট থেকে মুক্তির স্বাধীন অধিকার দেবে। তবে এর বিরোধিতাকারী সংস্থা ‘অ্যালায়েন্স ভিটা’ প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের কাছে লেখা এক খোলা চিঠিতে জানিয়েছে, মৃত্যু কখনোই কষ্টের সমাধান হতে পারে না এবং এটি মানুষের মর্যাদার পরিপন্থী।
তাদের মতে, এর ফলে অসুস্থ, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পরোক্ষ চাপের মুখে পড়তে পারেন। উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে এই অধিকার না থাকায় অনেক ফরাসি নাগরিক সুইজারল্যান্ড বা বেলজিয়ামের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে যেতেন যেখানে স্বেচ্ছামৃত্যু আগে থেকেই বৈধ। বর্তমানে নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, স্পেন, পর্তুগাল, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে ইচ্ছামৃত্যু বা স্বেচ্ছামৃত্যুর আইনি বৈধতা রয়েছে।
