বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আজ রাতে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি হচ্ছে। তবে অনেক আর্জেন্টাইনের কাছে এই ম্যাচ শুধুই ফুটবলের লড়াই নয়। ফকল্যান্ড যুদ্ধ, দিয়েগো ম্যারাডোনার কিংবদন্তিতুল্য ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা- সব মিলিয়ে ম্যাচটি বহন করছে ইতিহাস, আবেগ ও জাতীয় পরিচয়ের গভীর তাৎপর্য। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ২০২৬ বিশ্বকাপের আনঅফিশিয়াল সংগীত ‘লা কুয়ার্তা এসত্রেয়া’ অর্থাৎ চতুর্থ তারকা, যা দেশটির সম্ভাব্য চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্নকে ঘিরে তৈরি- সেখানেও ইংল্যান্ড ম্যাচের ঐতিহাসিক আবেগের প্রতিফলন রয়েছে। এ খবর দিয়ে অনলাইন বুয়েন্স আয়ারস টাইমস লিখেছে, গানটির অন্যতম প্রধান বিষয় মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ (ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ)। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জ উনিশ শতকে বৃটেনের নিয়ন্ত্রণে যায়। তবে আর্জেন্টিনা এখনও এটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। ১৯৮২ সালে এই দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও হয়। গানের কথায় বলা হয়েছে, ‘মালভিনাসের জন্য, দিয়েগোর জন্য, লিও (মেসি)-এর শেষ বিশ্বকাপের জন্য- আর্জেন্টিনা, তোমাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেখতে চাই।’ ৩৩ বছর বয়সী শিক্ষক এজেকিয়েল মুরমিস বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনাল জয় নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘এল পার্তিদো’ দেখে বের হওয়ার পর তিনি অন্য কিছু ভাবতেই পারছেন না। তিনি বলেন, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। ঘুমাতে পারছি না। অন্য কিছুই মাথায় আসছে না।
‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’
১৯৮৬ সালের ফাইনাল ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারায়। প্রথম গোলটি করেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। পরে তিনি নিজেই সেটিকে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে অভিহিত করেন। কারণ, তিনি হাত দিয়ে বল জালে পাঠিয়েছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর ম্যারাডোনা একক নৈপুণ্যে ইংল্যান্ডের একাধিক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে যে গোলটি করেন, সেটি ইতিহাসে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে পরিচিত। ২০২০ সালে মারা যাওয়া ম্যারাডোনার সেই দুই গোল এখনও আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি।
যুদ্ধের স্মৃতি এখনও জীবন্ত
১৯৮২ সালের দক্ষিণ আটলান্টিক যুদ্ধের একজন সাবেক সৈনিক আর্নেস্তো আলোনসো অবশ্য মনে করেন, বুধবারের ম্যাচকে যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে দেখা উচিত নয়। ওই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন বৃটিশ সেনা নিহত হন। শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয় বৃটেন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সরকার। আলোনসো বলেন, এক অর্থে, ১৯৮৬ সালেই ম্যারাডোনা আমাদের হয়ে প্রতিশোধ নিয়ে ফেলেছিলেন। অবশ্যই আমরা জিততে চাই। কিন্তু মালভিনাস ইস্যুর দায় জাতীয় ফুটবল দলের ওপর চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়।
আর্জেন্টিনার জাতীয় পরিচয়ের অংশ মালভিনাস
মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটির সংবিধানে এই ভূখণ্ডের দাবি উল্লেখ রয়েছে। স্কুলের পাঠ্যবই, দেয়ালচিত্র, ট্যাটু, এমনকি বহু পাড়া ও স্টেডিয়ামের নামেও রয়েছে ‘মালভিনাস আর্জেন্তিনাস’। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত আর্জেন্টিনায় বাম ও ডানপন্থীরা প্রায় সব বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও মালভিনাস এবং জাতীয় ফুটবল দল- এই দুটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত। তবে লেখক আন্দ্রেস বুরগোর মতে, ২০২৬ সালের পরিস্থিতি ১৯৮৬ সালের মতো নয়। তার ভাষায়, ১৯৮৬ সালের ম্যাচটি যুদ্ধের আবেগে গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। কিন্তু এবারের সেমিফাইনালের প্রতীকী গুরুত্ব তুলনামূলক কম, আর ক্রীড়াগত গুরুত্ব অনেক বেশি। বুরগো প্রথমে ‘এল পার্তিদো’ বইটি লেখেন। পরে সেটিই তথ্যচিত্রে রূপ নেয়। তবুও মালভিনাস ইস্যুর আবেগ এখনও কতটা প্রবল, তার প্রমাণ মিলছে তথ্যচিত্রটির হাউসফুল প্রদর্শনীতে।
বুয়েনস আইরেসে সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে ৩৩ বছর বয়সী বীমা কর্মকর্তা তোমাস বারবেইতো বলেন, খুব উদ্বিগ্ন লাগছে। মনে হচ্ছে এমন কিছুর প্রতিশোধ নিতে চাইছি, যার প্রতিশোধ নেয়ার প্রয়োজনই হয়তো নেই।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, সম্মানও আছে
সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর মেসি ও তার সতীর্থদের লাফিয়ে লাফিয়ে গাইতে দেখা যায়- ‘যে লাফাচ্ছে না, সে ইংরেজ!’ আর্জেন্টাইন সমর্থকদের আবেগ, গ্যালারির গান এবং প্রতিপক্ষকে খোঁচা দেওয়ার সংস্কৃতির তুলনা খুব কম দেশের সঙ্গেই করা যায়। অনেকের মতে, এই দিক থেকে ইংল্যান্ডই তাদের সবচেয়ে কাছাকাছি। দুই দেশেই ফুটবলের প্রতি আবেগ কখনও কখনও সহিংসতার রূপও নিয়েছে। আন্দ্রেস বুরগোর মতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও আর্জেন্টাইনরা ইংল্যান্ডের ফুটবল সংস্কৃতিকে সম্মান করে। তিনি বলেন, কিছু দেশ আছে, যেখানে ফুটবলের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই- যেমন যুক্তরাষ্ট্র। আবার কিছু দেশে আগ্রহ আছে, কিন্তু ফুটবল সংস্কৃতি নেই। ইংল্যান্ডে দুটিই আছে। আবেগও আছে, সংস্কৃতিও আছে। আর্জেন্টাইন সমর্থকরা সেটি স্বীকার করে এবং সম্মানও করে। তোমাস বারবেইতোও একই ধরনের অনুভূতির কথা বলেন। তার ভাষায়, বিষয়টি কিছুটা পরস্পরবিরোধী শোনাতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে, ইংরেজদের এবং তারা যেভাবে ফুটবলকে বাঁচিয়ে রাখে, সেটা আমার ভালো লাগে।
