শোকাহত মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় জাতীয় সংসদ চত্বরে চিরনিদ্রায় সমাহিত হলেন সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। দুদফা জানাজা শেষে রোববার তার মৃতদেহ জাতীয় সংসদের নির্ধারিত স্থানে সমাহিত করা হয়। এর আগে সাবেক এই স্পিকারের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে শোক প্রকাশ করা হয় এবং সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের স্মৃতিচারণ করেন। পরে বাদ আসর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার নিচের টানেলে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পঞ্চগড়-তেতুলিয়ার আপামর জনগণ, মরহুমের আত্মীয়-স্বজন, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী অংশ নেন।
জানাজার শুরুতেই মরহুম ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। এসময় সাবেক এই স্পিকারের স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য রাখেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিরোধী দলের নেতা ডা. মো: শফিকুর রহমান, চিফ হুইপ মোঃ নূরুল ইসলাম মনি, এবং পরিবারের পক্ষে মরহুমের ছেলে সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম জানাযায় উপস্থিত সকলকে কৃতজ্ঞতা জানান। এসময় জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার প্রয়ানে শোক প্রকাশ, শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এবং পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
জানাজা শেষে মরহুম ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের কফিনে রাষ্ট্রপতির পক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করেন তার সামরিক সচিব এএসএম বাহাউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বিএনপির পক্ষে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, চীফ হুইপ ও অন্যান্য হুইপবৃন্দ।
শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান শেষে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এর আগে, ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে বাদ জোহর মরহুমের প্রথম নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সাবেক এ স্পিকারের মৃতদেহ তার গ্রামের বাড়ি ও নির্বাচনী এলাকা পঞ্চগড়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
জাতীয় সংসদে শোক ও স্মৃতিচারণ
সাবেক স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে সততা, প্রজ্ঞা, শিষ্টাচার ও সংসদীয় গণতন্ত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণ করেছে জাতীয় সংসদ। শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা তাকে একজন সফল আইনজীবী, প্রজ্ঞাবান সংসদীয় ব্যক্তিত্ব, আপাদমস্তক ভদ্রলোক এবং দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৩তম কার্যদিবসে তার মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল ৩টায় অধিবেশন শুরু হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন ছিলেন সততা ও পেশাগত সুনামের অনন্য উদাহরণ। দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যক্তি, মক্কেল বা সহকর্মীর কাছ থেকে কখনও কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। দলের প্রতি তিনি ছিলেন শতভাগ নিবেদিতপ্রাণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক। তাকে প্রায় সবসময়ই থ্রি-পিস স্যুটে দেখা যেত। তার পোশাক-পরিচ্ছদই যেন ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে উঠেছিল। একবার তার এলাকার একজন ভোটার তাকে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় দেখে চিনতেই পারেননি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি কিংবা আইনজীবীÑ যে পরিচয়েই তাকে স্মরণ করি না কেন, তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ। তিনি সংসদের স্ট্যান্ডিং কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য ছিলেন। বয়সের কারণে এবার নিজে নির্বাচন না করে ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য দলের কাছে অনুরোধ করেছিলেন। আমার বিশ্বাস, তিনি নির্বাচন করলে জয়ী হতেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন পেশাগত ও রাজনৈতিকÑ উভয় জীবনেই সফল এবং বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি সততা, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমাদের নেতাকর্মীরা যখন নানা আইনি জটিলতায় পড়তেন, তখন তিনি বারবার তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আদালতে লড়েছেন, কিন্তু কখনও পারিশ্রমিক নেননি। তিনি বলতেন, এটি তার নৈতিক দায়িত্ব। এই ঋণ শোধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্পিকার হিসেবে তিনি সংসদকে প্রাণবন্ত করেছিলেন। আইন অঙ্গনে তিনি ছিলেন অনেকের শিক্ষক। মহান আল্লাহ যেন তার ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন ছিলেন একজন ‘সেলফ-মেড ম্যান’। নিজের মেধা ও যোগ্যতায় তিনি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর একাধিকটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কখনও নির্বাচনে পরাজিত হননি এবং শেষ দিন পর্যন্ত গণতন্ত্র ও নির্বাচনের প্রতি অবিচল ছিলেন। প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দোকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ঢাকা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে দূর থেকে হ্যাট, কোট ও ছাতা হাতে কাউকে দেখলেই বোঝা যেত তিনি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তিনি তার মক্কেলদের বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ও দায়িত্বশীল ছিলেন।
আলোচনা শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জাতি আজ একজন মহান রাজনীতিক ও সাদা মনের মানুষকে হারিয়েছে। স্পিকার হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করেছেন। তার বিরুদ্ধে কখনও কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি।
এ সময় বিএনপির এ এম মাহাবুব উদ্দিন খোকন, এনসিপির আখতার হোসেন এবং জামায়াতের নাজিবুর রহমানও শোক প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য দেন।
আলোচনা শেষে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। পরে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, রোববার ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। প্রবীণ এই রাজনীতিকের বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
