থৈ থৈ পানি। কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও কোমর সমান। ৬ ঘণ্টায় ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে রোববার রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। নিম্নাঞ্চলের বাড়িঘরে কোমর সমান পানি জমে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন রাজধানীর অনেক বাসিন্দা। ভারী বর্ষণের পানি প্রবেশ করে ভবনের নিচতলা, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায়। সকালে কর্মজীবী মানুষ বাসা থেকে বের হয়ে পড়েন বিপাকে। সড়কে সড়কে জলাবদ্ধতা থাকায় নানা মাধ্যমে পানি ডিঙিয়ে কর্মস্থলে পৌঁছান তারা। দুপুরের পর বৃষ্টি কমায় প্রধান প্রধান সড়কের পানি কিছুটা পানি কমলেও পাড়া মহল্লার অনেক সড়ক ছিল জলমগ্ন।
ঢাকায় ৬ ঘণ্টায় ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি, চলবে আরও ২ দিন: ঢাকায় রোববার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এমন বৃষ্টিপাত আরও দু’দিন অব্যাহত থাকার আভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ভারী বৃষ্টিপাতজনিত সতর্কবার্তায় আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, রোববার দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। নদীবন্দর সম্পর্কিত এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, রোববার সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সময়ে রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলসমূহের উপর দিয়ে দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। তাই এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এর সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান মানবজমিনকে বলেন, আমরা শহর করার জন্য পানি চক্র নষ্ট করে ফেলেছি। পানি চক্রের সিম্পল লজিক হচ্ছে যে, যখন জলীয় বাষ্প হয়, সেটা মেঘ হয়ে বৃষ্টি পড়ে। বৃষ্টির পানি ‘পানি’ হওয়ার পরে দুইটা ঘটনা ঘটে। একটা হচ্ছে, গড়িয়ে নিচের দিকে চলে যায়। আরেকটা হচ্ছে , ইনফিল্ট্রেশন হয়ে গ্রাউন্ড ওয়াটারে চলে আসে। তিনি বলেন, ঢাকায় ইনফিল্ট্রেশন হওয়ার জায়গা নাই, সব আমরা পাকা করে ফেলেছি। বাড়িঘর তৈরি করে, রাস্তাঘাট যা যা আছে করে একবারে টোটাল সারফেস আমরা অলমোস্ট পাকা করে ফেলেছি। ফলে পানি ইনফিল্ট্রেশন হচ্ছে না বা হওয়া একবারে কম হচ্ছে। পানি গড়িয়ে যাওয়ার জন্য ড্রেনেজ সিস্টেম লাগে। শহরে যে ন্যাচারাল ড্রেনেজ সিস্টেম ছিল, অনেকগুলো খাল ছিল, সেই খালগুলো আমরা নষ্ট করে ফেলেছি। ফলে ড্রেনেজ সিস্টেমের ক্যাপাসিটি অনেক কমে গেছে। এজন্য যদি প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, ড্রেনেজ সিস্টেমের পানি যতটুকু ড্রেন করতে পারে তার থেকে অনেক বেশি পানি যদি চলে আসে, তাহলে জলাবদ্ধতা হবেই।
মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার চিত্র: সরজমিন মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকায় দেখা যায়, প্রধান সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সড়কে দেখা যায় স্রোত। ড্রেনের ময়লা ভাসছিল সড়কের মধ্যে। যার প্রভাব পড়ে আশেপাশের সড়কগুলোতেও। অলিগলিগুলোও তলিয়ে ছিল পানির নিচে। কোথাও ছিল হাঁটু পানি। কোথাও আরও বেশি। এসব এলাকায় নিচতলার বাসা ও দোকানগুলোয় পানি ঢুকে যায়। বেশির ভাগ দোকান বন্ধ দেখা যায়। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেও মানুষকে বেগ পেগে হচ্ছিল। চরম বিড়ম্বনায় পড়েন শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও বয়োবৃদ্ধ মানুষ। জলাবদ্ধতায় কয়েকগুণ বেড়ে যায় রিকশা ভাড়া। অফিস বা কাজে যেতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। এসব এলাকায় বাস চলাচল কমে যায়। মাঝে মধ্যে সড়কে দু’একটি বাস দেখা যাচ্ছিল। জরুরি কাজ ছাড়া কেউই বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলেন না।
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিহা তাসনিম। সকাল সাড়ে ৯টায় স্কুলে যাওয়ার সময় কাজীপাড়ায় রিকশার জন্য ৩০ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় তিনি মানবজমিনকে বলেন, এখান থেকে স্কুলের ভাড়া ৩০ টাকা। প্রতিদিন যাতায়াত করি। কিন্তু আজ ১০০ টাকার নিচে কেউ যাবে না। ৪টা রিকশার সঙ্গে কথা বলেছি। তাদেরকে ছেড়ে দিয়ে এখন খালি রিকশাই পাচ্ছি না। পাশের গলিতে কথা হয় বাপ্পী রায় নামে এক কর্মজীবী যুবকের সঙ্গে। প্রতিদিন সেখান থেকে মিরপুর-১০ নম্বরে হেঁটে যান তিনি। এরপর বাসে করে কল্যাণপুর অফিসে যান। হাঁটু সমান পানির কারণে হেঁটে যেতে পারছেন না তিনি। ৩০ টাকার রিকশা ভাড়া বেড়ে হয় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। এ সময় বাপ্পী মানবজমিনকে বলেন, আমরা এখনো মানুষ হতে পারিনি। দেখেন মানুষের বিপদ দেখে রিকশা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। ৩০ টাকার ভাড়া ৪০ টাকা নিক। সর্বোচ্চ ৫০ টাকা নিতে পারে।
কিন্তু ৭০ থেকে ৮০ টাকার নিচে কেউ যাচ্ছে না। এভাবে আর কতো মানুষের গলা কাটবে? মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় অসুস্থ মাকে নিয়ে চরম বিড়ম্বনায় পড়েন সাইফুল হক নামের এক যুবক। চিকিৎসককে দেখাতে মাকে নিয়ে যাবেন কুর্মিটোলা হাসপাতালে। কিন্তু যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহন পাচ্ছিলেন না তিনি। অ্যাপসের মাধ্যমেও কোনো সিএনজি বা প্রাইভেটকার পাচ্ছিলেন না। সাইফুল মানবজমিনকে বলেন, কয়েকদিন থেকে এ এলাকায় সড়কে পানি। বৃষ্টি থামলে পানি নেমে যায়। একটু বৃষ্টিতেই ফের হাঁটু পানি। তিনি বলেন, গত কয়েকদিন তাও পানি নেমে যাচ্ছিল। এবার তো পানি নামার নামই নাই। গাড়ির জন্য এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। কিন্তু পাচ্ছি না। এভাবে চলতে থাকলে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হবে। একটি রিকশা পেয়েছি পানি পার করে দিবে। সামনে গিয়ে গাড়ি পাই কিনা দেখি। কল্যাণপুরের গৃহিণী তাসমিয়া তাসু বলেন, অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় শুধু কর্মজীবী মানুষ নয়, গৃহিণীদেরও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন নিচু অঞ্চলে বাসা বাড়ি প্লাবিত হয়ে ঘরে পানি ঢুকে যায়।
এলাকায় গ্যাস লাইনে আরও জ্যাম তৈরি হয়ে একেবারেই গ্যাস পাওয়া যায় না। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সিলিন্ডার সংগ্রহ কঠিন। পাশাপাশি এ সময় ঘন ঘন লোডশেডিং হয়, কখনো বৈদ্যুতিক লাইন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ভোগান্তিতে পড়ে যান নারীরা। শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মেহেদী হাসান শুভ বলেন, শেওড়াপাড়ায় প্রতি বছরই বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতা হয়, কিন্তু এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায়, ফলে সাধারণ মানুষের চলাচল, কর্মস্থলে যাতায়াত এবং ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাইছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে এমন একটি ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক।
কাওরান বাজার, তেজগাঁও, পান্থপথ, ফার্মগেটে যা দেখা গেল: টানা ভারী বর্ষণে কাওরান বাজার, পান্থপথ, তেজগাঁওয়ের গার্ডেন গলি, গ্রীন রোড, ফার্মগেটসহ আশপাশের এলাকার সড়ক ও অলিগলি পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও আবার কোমরসমান পানি জমেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই বাসা থেকে বের হচ্ছেন না। আর যারা বের হচ্ছেন, তাদের জলাবদ্ধ সড়কের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে রিকশায় গুনতে হচ্ছে ২০ টাকা। গতকাল সরজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চারদিকে পানিতে থৈ থৈ করছে রাস্তার ও অলিগলি। বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের পেছনের কয়েকটি এলাকায় কোথাও কোথাও কোমর সমান পানি জমেছে। পানির কারণে স্বাভাবিক চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জলাবদ্ধ অংশটুকু পার হতে রিকশার ওপর নির্ভর করছেন। রিকশাচালকরাও শুধু পানি জমে থাকা অংশ পার করে দিতে যাত্রীপ্রতি ২০ টাকা করে নিচ্ছেন। পান্থপথ, গ্রীন রোড ও তেজগাঁওয়ের বিভিন্ন গলিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। সড়ক ও অলিগলি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসিন্দাদের অনেকেই ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। জলাবদ্ধ সড়কে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
পান্থপথের রিকশাচালক হাফিজুর রহমান বলেন, এমন বৃষ্টি আগে কখনো দেখিনি। বহু বছর পর এমন জলাবদ্ধতা দেখলাম। আমরা রিকশা দিয়ে মানুষকে শুধু পানি জমে থাকা জায়গাটুকু পার করছি। আপাতত দূরের যাত্রী নিচ্ছি না। পানি নামতেও অনেক সময় লাগবে। ফার্মগেটের চাকরিজীবী কাওছার আহমেদ বলেন, এমন বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা আমি ঢাকায় আগে কখনো দেখিনি। রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা যে খারাপ, তা আগে থেকেই জানা। সরকারের কাছে দাবি, এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হোক। তা না হলে জলাবদ্ধতায় মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ থাকবে না। গ্রাম থেকে পরিবার নিয়ে ঢাকায় ডাক্তার দেখাতে আসা ইদ্রিস বেপারীও পড়েছেন বিপাকে। তিনি বলেন, ডাক্তার দেখাতে এসে পরিবার নিয়ে বিপদে পড়েছি। জলাবদ্ধতার কারণে ডাক্তারও চেম্বারে আসবেন না বলে ক্লিনিক থেকে জানানো হয়েছে। ঢাকায় এমন পরিস্থিতির কথা আগে খবরে দেখতাম, এবার সরাসরি দেখলাম। দু’দিন হলো এসে রুমে বদ্ধ হয়ে বসে আছি। টানা বৃষ্টি ও পানি জমে থাকার কারণে রাস্তায়ও ঠিকমতো হাঁটা যাচ্ছে না।
যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, ফকিরাপুল, আরামবাগ এলাকা: টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর মতিঝিল, ফকিরাপুল, আরামবাগ, খিলগাঁও, মালিবাগ, দৈনিক বাংলা মোড়, যাত্রাবাড়ীসহ আশপাশের অধিকাংশ এলাকার সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতায় নাকাল হয়ে পড়ে এসব এলাকার বাসিন্দারা। ব্যাংকপাড়া নামে পরিচিত মতিঝিলের সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের শুরুতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ পথচারীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। জলাবদ্ধতা থাকায় এদিন গণপরিবহনেরও সংকট দেখা দেয়। বৃষ্টিতে ভিজে দীর্ঘ সময় বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ফলে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে অফিসগামী মানুষকে প্যান্ট হাঁটুর উপরে গুটিয়ে কিংবা কোমর সমান পানি মাড়িয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে যেতে দেখা যায়। আবার সরু গলিতে পানি জমে যাওয়ায় অনেক বাসিন্দা প্রধান সড়কে পৌঁছাতে না পেরে কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েন।
জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালেও পানি প্রবেশ করে। এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এ ছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন স্থানে অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহন বিকল হয়ে সড়কে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ফলে দীর্ঘ যানজটেরও সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে জলাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে রিকশা ও অটো-রিকশাচালকরা ভাড়া বেশি দাবি করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। ওদিকে টানা বর্ষণে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ভবনের নিচতলায় পানি জমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ে নেতাকর্মীরা। কার্যালয়ের ভেতরে রিকশা দিয়ে নেতাকর্মীদের অফিস ত্যাগ করতে দেখা গিয়েছে। শুধু বিএনপি’র কার্যালয় নয় নয়াপল্টন সড়কের বিভিন্ন গাড়ির শো-রুম ও বিপণিবিতানেও পানি প্রবেশ করে। কুমিল্লা থেকে চাকরির ভাইবা দিতে এসেছিলেন রাকিব হোসেন। রিকশায় করে মতিঝিল পর্যন্ত এসেছিলেন। কিন্তু অফিসের যাওয়ার পথ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় প্রথমে প্যান্ট ভাঁজ করে হাঁটু পর্যন্ত উঠিয়ে জনতা ব্যাংকের পাশের গলি দিয়ে যাচ্ছিলেন।
কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর পানি তার কোমর সমান হয়ে যায়। কোনোমতে সার্টিফিকেটের ফাইল আর মোবাইল দু’হাতে নিয়ে বাধ্য হয়ে অফিসের দিকে ছুটে যান তিনি। রাকিব হোসেন বলেন, আজ ভাইবা ছিল কিন্তু পানিতে পুরো ড্রেস ভিজে গিয়েছে। কী হবে আল্লাহই ভালো যানে। সড়কে গাড়ি চলার সময় ঢেউয়ে জুতা কাপড় সব ভিজে গিয়েছে। অফিসে পৌঁছার আগেই অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে গেলাম। অটোতে করে দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত এসেছিলাম কিন্তু পানি ব্যাটারিতে প্রবেশ করায় রিকশা বিকল হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়েই হেঁটে রওনা দিয়েছি কী করবো ঐদিকে রিকশাও যায় না। সকাল নয়টা যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া থেকে ফার্মের মোড়গামী সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সড়কের পাশের দোকানে দাঁড়িয়ে ছিলেন শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আহমেদ। শুধু ইয়াসিন নয়, প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আটকে পড়েন এখানে, প্রত্যাশা শুধু রিকশা পেলেই কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিবেন।
ইয়াসিন বলেন, ভোর থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে সড়ক ডুবে গিয়েছে। ড্রেনের পানি সব সড়কে এই নোংরা পানি দিয়ে হাঁটা যায় না। রিকশার জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু কোনো রিকশা পাচ্ছি না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাজে হওয়ায় আজ সড়ক ডুবে গেছে। সরকারকে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। আইএফআইসি টাওয়ারের সামনে রিকশার সন্ধান করে বেড়াচ্ছিলেন মোরশেদ আলম। কিন্তু রিকশাচালকরা ভাড়া বেশি দাবি করায় ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন তিনি। মোরশেদ আলম বলেন, একরাতের বৃষ্টিতেই প্রধান সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছে। সামনে যদি আরও বৃষ্টি হয় তাহলে কী হবে আল্লাহই ভালো জানেন। খালগুলো দখল করে স্থাপনা গড়ে উঠেছে। খাল উদ্ধার না হওয়ায় পানি যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে ফলে একটু বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। একে তো জলাবদ্ধতা এর মধ্যে ব্যবসা গড়েছে রিকশাচালকরা। ২০ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা দাবি করছে। এই দেশ আর ঠিক হলো না। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু আমাদের সাধারণ মানুষের উন্নয়ন নিয়ে কেউ চিন্তা করে না।
কী করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জানিয়েছে, টানা ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে ভোর থেকে মাঠে ডিএসসিসি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সড়ক সচল করেছেন প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নীলক্ষেত সংলগ্ন ইডেন মহিলা কলেজের ২ নম্বর গেটের বিপরীত একটি বড় গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক বন্ধ হয়ে গেলে ডিএসসিসি প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যান। দুপুর ১টার দিকে সড়ক থেকে গাছটি সম্পূর্ণ অপসারণ করা হয়। তাছাড়াও, মাঠপর্যায়ে কাজ করেছে ডিএসসিসি’র ওয়ার্ডভিত্তিক ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কমলাপুরের ২টি এবং ধোলাইখালের ১টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পানির পাম্পের মাধ্যমে আগেই পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানায় ডিএসসিসি। ডিএসসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, টানা ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও আমাদের কর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভোর থেকে মাঠে রয়েছে। জলাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, অতিভারী বর্ষণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, গুলশান, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় পানি জমে মানুষের চলাচলে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। ড্রেন, নালা ও পানি নিষ্কাশনের পথগুলো সচল রাখতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। যেসব এলাকায় পানি জমে আছে, সেখানে দ্রুত পানি অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি মোতায়েন করা হয়েছে। ওয়াটার পাম্পগুলো সচল রাখা হয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, অতিভারী বর্ষণের ফলে লেকসহ রাস্তাঘাট সবকিছুই ডুবে গেছে। গুলশান লেকের মতো লেক থেকেও পানি উপচে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়েছে। আমি নিজে সরজমিন বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করছি।
