সংসদে অর্থমন্ত্রী

মুজিব বর্ষ উদ্যাপনে রাষ্ট্রের খরচ ৯৮৩ কোটি টাকা

ফন্ট সাইজ:

‘মুজিববর্ষ’ পালন উপলক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি, বেদি, বিভিন্ন সরকারি অফিসে ব্রোঞ্জ, তামা ও মার্বেল পাথরের মূর্তি নির্মাণ এবং জাতীয় পর্যায়ে সময় গণনার ডিজিটাল বোর্ড তৈরিসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরকারের মোট কতো টাকা ব্যয় হয়েছে, তার হিসাব জাতীয় সংসদে প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কর্তৃক সর্বমোট ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি টাকা বলে জানান তিনি।
একইসঙ্গে রাজস্ব ফাঁকি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। রোববার জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্বে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য জনাব মো. মাহবুবুর রহমান বেলালের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এই খরচের খতিয়ান তুলে ধরেন এবং ‘মুজিববর্ষ উদ্যাপন বাবদ ব্যয় বিবরণী’র একটি কপিও সংযুক্ত করে সংসদে পেশ করেন।

এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের সর্বশেষ হিসাব ও তা পুনরুদ্ধারে সরকারের নেয়া নানা পদক্ষেপের তথ্য জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বলে জানিয়েছেন তিনি। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের করা প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান। সংসদে উত্থাপিত তথ্যে মন্ত্রী জানান, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের উচ্চ হার কমিয়ে আনার আবশ্যকতা রয়েছে, যা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও অন্যতম বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংকিং খাতের শ্রেণিকৃত ঋণের হার কমিয়ে আনার নিমিত্ত ব্যাংকসমূহের জন্য শ্রেণিকৃত ঋণ রেজ্যুলেশন স্ট্র্যাটেজি সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যমান ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন হালনাগাদ করা হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, একজন ঋণগ্রহীতা কর্তৃক সমগ্র ব্যাংকিং খাত হতে ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের জন্য গৃহীতব্য ব্যবস্থাসমূহ কিছু কিছু অন্যান্য খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের জন্যও আরোপের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অর্থঋণ আদালতের বিচারক প্যানেল বা জুরি বোর্ডে অভিজ্ঞ ব্যাংকার অন্তর্ভুক্তকরণ, খেলাপি ঋণগ্রহীতাগণ যাতে রিট করে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থবির করতে না পারে সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের কাজ চলছে।

ওদিকে দেশের রাজস্ব ঘাটতি পূরণ এবং চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেয়া নানা পদক্ষেপের কথা জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ধনী ও করপোরেটদের কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, সাধারণ জনগণের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপিয়ে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ধনীদের কর ফাঁকি বন্ধ করতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কর আদায়ের প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বচ্ছ করতে করপোরেট করদাতাদের জন্য খুব শিগগিরই ই-রিটার্ন ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে করদাতাদের তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে এপিআই সংযোগের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজ চলছে।

এদিকে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ সম্পর্কে গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ, কে, এম, ফজলুল হক মিলনের প্রশ্নেরও উত্তর দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, বিগত ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে দেশের অর্থনীতিতে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছিল, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে তা ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কমতে শুরু করেছিল। ধারাবাহিক পতন শেষে ২০২৫ সালের অক্টোবরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিক হেডলাইন মূল্যস্ফীতি ৮.১৭ শতাংশে নেমে আসে। তবে পরবর্তীতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের বিভিন্ন অভিঘাতের ফলে মূল্যস্ফীতি আবার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ২০২৬ সালের মে মাসে ৯.৪২ শতাংশে দাঁড়ায়।

বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজারে অতিরিক্ত চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশের মতো উচ্চস্তরে বহাল রেখেই চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি কেবল চাহিদার কারণে নয়, বরং পণ্যের জোগান কমে যাওয়ার কারণেও হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কম হওয়া এবং বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়েছে। এই জোগান সংকট কাটাতে এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

এই প্রণোদনা প্যাকেজের কারণে বাজারে নতুন করে চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি বা টাকার অবমূল্যায়ন ঘটবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকাই আসবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা অতিরিক্ত তারল্য থেকে, আর বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব উৎস থেকে সরবরাহ করবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা সামলাতে এবং ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নমনীয় ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন