দেশের পাঁচ জেলার পাঁচটি পয়েন্টে তিনটি নদীর পানি এখনো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে কিছু কিছু জেলার নদী অববাহিকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
রোববার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়, সাঙ্গু নদীর বান্দরবান ও দোহাজারী, কুশিয়ারা নদীর মারকুলি ও ফেঞ্চুগঞ্জ এবং সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে পানি বিপদসীমার উপরে রয়েছে।
এদিকে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ২ লাখ পরিবার পানিবন্দি। ঘরে খাবার নেই, সুপেয় পানি নেই, শিশু খাদ্যের জন্য হাহাকার। অন্যদিকে, আগামী দুইদিনে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির মুহুরী, ফেনী নদী, সিলোনিয়া ও হালদা নদীর পানি কিছু স্থানে বিপদসীমা অতিক্রম করে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। এ সময় লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর কিছু নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
এ ছাড়া সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কয়েকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বাড়তে থাকায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলেও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। তবে বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের কয়েকটি নদীর পানি কমতে পারে। ফলে এসব এলাকার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে জানান, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ২ লাখ পরিবার পানিবন্দি। ঘরে খাবার নেই, সুপেয় পানি নেই, শিশু খাদ্যের জন্য হাহাকার। অথচ ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না প্রান্তিক এলাকায়। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের বেশির ভাগই বিতরণ হচ্ছে মূল সড়কের আশপাশে। নৌকা ভেঙে যে গ্রামগুলোতে যেতে হয়, সেখানে কেউ যাচ্ছে না।
বাঁশখালীর বাহারছড়া, সরল, শেখেরখিলের বাড়িঘরে পাঁচদিন ধরে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি। চুলা জ্বলছে না। ভেসে গেছে ধানের গোলা, পুকুরের মাছ। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট। একই অবস্থা সাতকানিয়ার নলুয়া, তেমুহনি, ঢেমশা ও চন্দনাইশের একাধিক ইউনিয়নে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই তিন উপজেলার বাইরেও বোয়ালখালী, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর বড় অংশ পানিবন্দি। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি- এসব এলাকার জন্যও প্রয়োজন আলাদা বরাদ্দ।
ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেনের দাবি, সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে ত্রাণ পৌঁছাতে সময় লাগছে। দুর্গত মানুষের কষ্ট লাঘবে ত্রাণ মন্ত্রণালয় সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। সাতকানিয়া-বাঁশখালীর বাসিন্দারা বলছেন, পাঁচদিনে গ্রামে এক প্যাকেট শুকনো খাবারও যায়নি। শিশুরা মুড়ি-স্যালাইন খেয়ে আছে।
বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারি যে ত্রাণ পাওয়া গেছে, তা একটি ইউনিয়নের জন্য যথেষ্ট নয়।’
স্থানীয়দের প্রশ্ন, পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হবে। কিন্তু এখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অজুহাতে প্রান্তিক মানুষকে ত্রাণবঞ্চিত রাখা হচ্ছে কেন? নৌকা, স্পিডবোট, স্বেচ্ছাসেবী দল, এগুলো দুর্যোগ মোকাবিলার মৌলিক উপকরণ। সড়ক ডুবলে নৌপথই ভরসা। সেই নৌপথে ত্রাণ না গেলে ‘সব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে’-এই কথার দাম কতোটুকু? চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের প্রচার সম্পাদক ও বাঁশখালীর প্রেমবাজার এলাকার সন্তান ফারুক আব্দুল্লাহ বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামে ২ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি। তাদের সহযোগিতার বিষয়ে আমরা কোনো আশ্বাস চাই না। আমরা দ্রুত ত্রাণ চাই।
চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে পৃথক ঘটনায় এক কিশোর ও এক কোরআনের হাফেজ মাওলানা আতাউল্লাহ (২০)সহ ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রোববার বিকালে উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিবাজার ফতেহ আলী সিকদারপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে হাফেজ মাওলানা আতাউল্লাহ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে চকরিয়া সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বরইতলী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নাছিম হেজাজী হাফেজ আতাউল্লাহর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অপরদিকে, বন্যার স্রোতে ভেসে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২৩ ঘণ্টা পর শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল।
নিহতরা হলেন- বরইতলী ইউনিয়নের শান্তিবাজার ফতেহ আলী সিকদারপাড়ার মাওলানা নেছার আহমদের ছেলে হাফেজ মাওলানা আতাউল্লাহ (২০) ও কৈয়ারবিল ইউনিয়নের খোজাখালী জলদাশপাড়ার তুফান দাশের ছেলে সুজিত দাশ (১০)। জানা গেছে, শনিবার (১১ই জুলাই) বিকাল ৫টার দিকে কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খোজাখালী জলদাশপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে পড়ে সুজিত দাশ নিখোঁজ হয়।
স্টাফ রিপোর্টার, যশোর থেকে জানান, টানা তিনদিনের ভারী বৃষ্টিতে বেনাপোলে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। বন্দরের বিভিন্ন শেড, ইয়ার্ড ও অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে জমেছে হাঁটু পানি। ড্রেনেজ সংকটের কারণে পানি সরছে না। হাঁটুসমান পানিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে আমদানিকৃত কোটি কোটি টাকার পণ্য। এ ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ব্যবসায়ীরা। পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বন্দর এলাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানান আমদানি ও রপ্তানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা।
রোববার সরজমিনে বন্দর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বন্দরের ৩ নম্বর গেট সংলগ ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮ নম্বর শেডের আশেপাশে হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। এ ছাড়া ৯ নম্বর শেডের ভেতরে সবচেয়ে বেশি পানি প্রবেশ করছে। সেখানে নিচের সারিতে রাখা বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত বিভিন্ন শিল্পকারখানার কাঁচামাল, কাপড়, কেমিক্যাল ও অন্যান্য পণ্য পানিতে তলিয়ে গেছে। কয়েকটি শেড তালাবদ্ধ থাকায় ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাব নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, বন্দর ব্যবহারকারী সংগঠনগুলা বহু বছর ধরে ড্রেনেজ সমস্যাসহ বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার বিষয়টি তুলে ধরছে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ তরফে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে প্রতি বছর শতাধিক আমদানিকারক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তবে বেনাপোল স্থল বন্দরের উপ-পরিচালক কাজী রতন বলেন, টানা ভারী বৃষ্টির কারণে কয়েকটি শেডে পানি প্রবেশ করেছে এবং বেশকিছু পণ্য ভিজে গেছে। বিশেষ করে পণ্য চালানের নিচের সারিতে রাখা পণ্যের কার্টনগুলো ভিজে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এসব কার্টনের পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে বৃষ্টির মাত্রা কমে যাওয়ায় আমরা বর্তমানে পাওয়ারপাম্পের মাধ্যমে দ্রুত পানি অপসারণের কাজ শুরু করেছি। গত তিনদিন অবিরাম বৃষ্টির কারণে কাজ কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। বৃষ্টি কমে গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।
