মালয়েশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য জোহর নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে দেশটির জাতীয় রাজনীতির ভরকেন্দ্র নাড়িয়ে দিয়েছে বারিসান ন্যাশনাল (বিএন)। মালয় মেইল-এর অনানুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, ৫৬ আসনের বিধানসভায় বিএন অন্তত ৪৮টি আসনে জয় দাবি করেছে। কোনো কোনো প্রাথমিক গণনায় সংখ্যাটি ৪৯ পর্যন্ত উঠেছে। বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন পাকাতান হারাপান (পিএইচ) থেমে গেছে মাত্র ৮টি আসনে। আর একসময়ের শক্তিশালী পেরিকাতান ন্যাশনাল (পিএন) এবার প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ এ রাজ্য নির্বাচনে।
ফলাফল ঘোষণার পর বিএন চেয়ারম্যান আহমদ জাহিদ হামিদি ও জোহরের মুখ্যমন্ত্রী ওন হাফিজ গাজির শিবিরে বিজয়োৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। কিন্তু একই ফলাফল কুয়ালালামপুরে ঐক্য সরকারের প্রধান আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্য বয়ে এনেছে গভীর অস্বস্তি। কারণ এটি নিছক একটি রাজ্য নির্বাচন নয়, বরং আসন্ন ১৮তম সাধারণ নির্বাচনের (জিই-১৮) এক নির্মম এসিড টেস্ট।
জোহরের এই ফলাফলকে একক ঘটনা হিসেবে না দেখে বরং একটি ধারাবাহিকতার আলোকে বিচার করলে বিএন-এর শক্তি স্পষ্ট হয়। ২০২২ সালের রাজ্য নির্বাচনে বিএন জিতেছিল ৪০টি আসন, যা তখনই ছিল জোহরে তাদের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফল। চার বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা প্রায় ৪৮-এ পৌঁছানো প্রমাণ করে যে, কেন্দ্রে ক্ষমতাচ্যুতি বা একের পর এক দুর্নীতির মামলার ধাক্কা সত্ত্বেও তৃণমূল পর্যায়ে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো কেবল টিকে থাকেনি, বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে।
দি এজ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ফলাফল পিএইচ-এর জন্য একটি সতর্কবার্তা। জোহরের গ্রামীণ ও আধা-শহুরে মালয়-অধ্যুষিত আসনগুলোতে বিএন-এর ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক অটুট থাকায় এই ব্যবধানের মূল কারণ। উল্টো দিকে, ২০২২ সালে ১২টি আসন পাওয়া পিএইচ এবার এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসায় বোঝা যায়, শহুরে ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাদের আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে ফিকে হয়েছে।
দি এজ-এর মূল্যায়নে আরও জানা গেছে, এই ভরাডুবির পেছনে দুটি প্রধান কারণ। এক, একসময় যে শহুরে ও তরুণ ভোটাররা সংস্কারের প্রতিশ্রুতিতে পিএইচ-এর দিকে ঝুঁকেছিলেন, তাঁরা এখন হতাশ। দুই, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ জনআস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো, বিএন ও পিএইচ ভোটের এই ব্যাটল ফিল্ডে একই ঐক্য সরকারের শরিক। ফলে জোহরের এই ফলাফল কার্যত জোটের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য একতরফাভাবে বিএন-এর দিকে হেলিয়ে দিয়েছে। ফলে নিজেদের সমর্থক ধরে রাখতে ব্যর্থ পিএইচ এখন শরিক বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) এর কাছেই দুর্বল অবস্থানে।
সিএনএ-র পর্যবেক্ষণে, এই নির্বাচনের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো মালয় রাজনীতির ডার্ক হর্স খ্যাত মহিউদ্দিন ইয়াসিনের পেরিকাতান ন্যাশনাল প্রায় বিলুপ্তির পথে। জাতীয় পর্যায়ে বিরোধী শিবিরের প্রধান শক্তি হিসেবে পরিচিত পিএন জোহরে কার্যত দাঁড়াতেই পারেনি। এর ফলে অন্তত জোহরে জাতীয় রাজনীতির চিরচেনা ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভেঙে একটি স্পষ্ট দ্বিমুখী মেরুকরণের আভাস দেখা যাচ্ছে, যেখানে একদিকে পুনরুজ্জীবিত বিএন, অন্যদিকে দুর্বল হয়ে পড়া পিএইচ এবং বিলুপ্ত প্রায় পিএন।
দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, রাজনৈতিকভাবে এই জয়ের সবচেয়ে বড় লাভবান আহমদ জাহিদ হামিদি। দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন ও চাপের মুখে থাকা জাহিদের জন্য জোহর একটি বৈধতার সিলমোহর। ভূমিধস জয় তাঁর নেতৃত্বকে অভ্যন্তরীণভাবে যেমন সংহত করেছে, তেমনি ঐক্য সরকারে বিএন-এর দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই জয়ের পরিণতি হিসেবে বিএন-এর ভেতর থেকে আগাম সাধারণ নির্বাচনের দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠতে পারে, যা সরাসরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সরকারের ওপর চাপ তৈরি করবে। অবস্থা এমনিই যে, আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এখন দ্বিমুখী। একদিকে তাঁকে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে সরকারের হারানো জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার করতে হবে; অন্যদিকে বিএন-এর সঙ্গে অস্বস্তিকর জোটের সমীকরণ টিকিয়ে রাখতে হবে। এছাড়া জোহর জয়ের পর বিএন স্বাভাবিকভাবেই সরকারে নিজেদের প্রভাব, মন্ত্রিত্ব ও দাবি দাওয়া বাড়াতে চাইবে যা পিএইচ-এর নিজস্ব সমর্থক ও জোটের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। কারণ সামনের জিই-১৬ যতই ঘনিয়ে আসবে, স্থিতিশীলতা বনাম পরিবর্তনের এই লড়াই ততই তীব্র হয়ে উঠবে।
