এক ঐতিহাসিক এবং বিতর্কিত ফুটবল মহাকাব্যের পর আজ একটি মেগা কোয়ার্টার ফাইনাল দেখতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবল। মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা শক্তি ফ্রান্স এবং দুনিয়াকে চমকে দেয়া দল মরক্কো। তাই ফুটবলপণ্ডিতরা বলছেন, এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের সেই ব্লকবাস্টার সেমিফাইনালের মহারণ। যেখানে মরক্কোর স্বপ্ন চুরমার হয়ে গিয়েছিল। আর এটা করেছিল কিলিয়ান এমবাপ্পের দল। তবে এবার কিন্তু প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
একদিকে ফরাসিদের টানা তৃতীয়বার ফাইনালে পৌঁছানোর অদম্য জেদ, অন্যদিকে মরক্কোর বুকে জ্বলছে বদলার আগুন। আমরা সাধারণত কী দেখি। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এই দুই দলের লড়াই কেবল ট্যাকটিক্স বা গোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে রাজনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সুপারস্টার হওয়ার প্রবল ইচ্ছা। এবার যখন দল দুটো মুখোমুখি হচ্ছে তখন সামনে আসছে ২০২২-এর এক অসম্পূর্ণ রূপকথার গল্প। বরাবরই ফ্রান্সে বসবাসকারী বিশাল মরক্কান ডায়াসপোরা এই ম্যাচটিকে একটি সম্পূর্ণ ভিন্নমাত্রায় নিয়ে যায়। ২০২২ সালের ১৪ই ডিসেম্বর।
কাতারে আল বাইত স্টেডিয়ামে ২-০ গোলে জয়ী হয়েছিল ফ্রান্স। তখন প্যারিসের রাস্তায় উৎসব আর কান্নার অদ্ভুত মিশ্রণ দেখা গিয়েছিল। মরক্কো প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে উঠেছিল। চমক সৃষ্টি হয়েছিল ফুটবল দুনিয়ায়। তাদের সেই ঐতিহাসিক দৌড় থামিয়ে দিয়েছিল ফরাসিরা। এ কারণেই বলা হচ্ছে, এই ম্যাচটি কেবল মরক্কোর জন্য কোয়ার্টার ফাইনাল নয়, এটি অসম্পূর্ণ গল্পের নতুন এক অধ্যায়। যার জন্য চার বছর ধরে অপেক্ষা করছে মরক্কো। সেই রাতে মরক্কান খেলোয়াড়দের চোখে ছিল পানি। বোস্টনের মাঠে সেই পানি রূপান্তরিত হতে চলেছে শক্তিতে। এবারের বিশ্বকাপে এমবাপ্পে অপ্রতিরোধ্য। মরক্কোর পুনরুত্থান থামাতে চান। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাই এই খেলাটিকে ঘিরে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ফরাসিদের জন্য কঠিন পরীক্ষা। রাউন্ড অব ষোলোতে ফ্রান্স অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছে প্যারাগুয়ের সঙ্গে। অনেকটা কষ্টে এমবাপ্পের দল ১-০ গোলে জয় পায়।
কড়া মার্কিংয়ের মধ্যে ছিলেন এমবাপ্পে। অন্যদিকে মরক্কো রাউন্ড অব ষোলোতে কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে এক ভয়ঙ্কর রূপে আবির্ভূত হয়েছে। তারা প্রমাণ করেছে যে, ২০২২ সালের সাফল্য কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। তাদের রক্ষণভাগ আগের মতোই ইস্পাত কঠিন। আক্রমণভাগ এখন আরও বেশি গতিসম্পন্ন। হাকিম জিয়েশ, ইউসেফ এন নেসিরির মতো তারকারা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছেন তারা যেকোনো মুহূর্তে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম। আর্জেন্টিনা মিশরের ম্যাচের পর মাঠের বাইরে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক জারি রয়েছে। এই খেলায় রেফারি ল্যাতেজিয়ারের ভূমিকা ছিল অনেকটাই রহস্যজনক। বিতর্কিত রেফারি খেলাটির গতি বারবার থামিয়ে দেন। ফ্রান্স-মরক্কোর খেলার আগেই নতুন এক বিতর্ক। এই বিতর্ক খেলা ছেড়ে রেফারিদের নিয়েই। ফিফা এই হাইভোল্টেজের কোয়ার্টার ফাইনালের জন্য সম্পূর্ণ আর্জেন্টিয়ান রেফারিং প্যানেল নিয়োগ করেছে। মূল রেফারি ফাকুন্দো তেলো, সঙ্গে দুই আর্জেন্টাইন সহকারী হুয়ান পাবলো বেলাত্তি এবং গ্যাব্রিয়েল এই ম্যাচ পরিচালনা করবেন।
এই সিদ্ধান্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় আক্ষরিক অর্থেই আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সের সমর্থকরা মনে করছেন- এটি একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। কারণ ফ্রান্স যদি এই ম্যাচ জেতে তবে সেমিফাইনাল পেরিয়ে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে যাওয়ার স্মৃতি ফরাসিরা এখনো ভুলতে পারেনি। মিশর-আর্জেন্টিনার মধ্যকার সামপ্রতিক ম্যাচ নিয়ে বিতর্ক চলছেই। এর মধ্যে আর্জেন্টিনার পক্ষে একটি স্টপেজ টাইম গোল এবং মিশরের বাতিল হওয়া গোল নিয়ে ফিফা এবং রেফারিকে অভিযুক্ত করছেন ফুটবলভক্তরা। ফ্রান্স-মরক্কোর খেলায় আর্জেন্টাইন রেফারি নিয়োগকে অনেকে ফিফা’র পাল্টা চাল হিসেবে দেখছেন। এসবের মধ্যেও দুই তারকার লড়াই জমে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একদিকে এমবাপ্পে অন্যদিকে হাকিমি। পিএসজি’র প্রাক্তন সতীর্থ বাস্তবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মজার ব্যাপার হচ্ছে- দেশের জার্সিতে একে অপরের বিপক্ষে যখন মাঠে নামেন তখন বন্ধুত্বের কোনো জায়গা থাকে না। বলতেই হয়, এমবাপ্পে বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের একজন অবিসংবাদিত সম্রাট। পেলে বা ম্যারাডোনার মতো সর্বকালের সেরাদের তালিকায় পাকাপাকিভাবে নিজের নাম লেখানোর ব্যাপারে তিনি মরিয়া। তার অন্যতম লক্ষ্য টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা। যা ফুটবলের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে সারাক্ষণ ছিলেন মার্কিংয়ে। মরক্কোর বিরুদ্ধে তিনি জ্বলে উঠতে চান- এমনটাই বলছেন সংবাদমাধ্যমকে। অন্যদিকে আশরাফ হাকিমি মরক্কোর রক্ষণভাগে আক্রমণের মূল উৎস।
হাকিমি যদি এমবাপ্পেকে আটকাতে পারেন তবেই তা হবে মরক্কোর জয়ের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। এই ম্যাচে নতুন কোনো সুপারস্টারের জন্ম হতে পারে। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মরক্কোর তরুণ প্রতিভাদের জন্য সবচেয়ে বড় মঞ্চ। ইয়াসিন বুনু যদি গোলপোস্টের নিচে আরও একবার দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারেন তাহলে এমবাপ্পেকে থামানো সম্ভব।
অন্যথায় নাটকীয় কিছু ঘটতে পারে। এটা নিছক ৯০ বা ১২০ মিনিটের ফুটবল নয়। ইতিমধ্যেই বলা হচ্ছে, খেলাটি হবে অভিবাসন ও ইতিহাসের এক জটিল ক্যানভাস। আমরা সবাই জানি, ফরাসি দলের অনেক খেলোয়াড়ের শেকড় আফ্রিকায়। যা এই ম্যাচটিকে একটি অদ্ভুত ভ্রাতৃত্বপূর্ণ বা তীব্র প্রতিযোগিতামূলক রূপ দেবে। মরক্কোর কাছে এটি শুধু আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব নয়। এটা প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক ঐতিহাসিক সুযোগ।
ফ্রান্স শিবিরে তাই টানটান উত্তেজনা। যদি কোনো কারণে ফ্রান্স হেরে যায়- তা হবে এক সোনালি প্রজন্মের আধিপত্যের আকস্মিক পতন। মরক্কোর জয় মানে বিশ্ব ফুটবলের চিরাচরিত ইউরোপ, ল্যাতিন আমেরিকার মেরূকরণ ভেঙে নতুন এক বিশ্ব শক্তির চূড়ান্ত উত্থান। বোস্টনের মাঠে যখন রেফারির বাঁশি বাজবে তখন দুই দলের সামনেই থাকবে ইতিহাস গড়ার হাতছানি। বলুন তো ফরাসি নীল না মরক্কান লাল? কার রঙে বিশ্বকাপের আকাশ রঙিন হবে।
