দেশের ভেতরে ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বুধবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তরফে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অভ্যন্তরে রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে এবং উজানে ভারতের মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। আগামী তিনদিনও চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন ভারতের উজানে ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এরইমধ্যে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে বান্দরবানে সাঙ্গু ও লামায় মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। লামা পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
আগামী তিনদিন চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সিলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার বেশকিছু স্থানে নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এ ছাড়া, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। ওদিকে, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে। ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কিছু কিছু স্থানে বন্যার শঙ্কা রয়েছে। রংপুর বিভাগে তিস্তা নদীর পানিও আগামী তিনদিন দ্রুত বাড়তে পারে।
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাঙ্গামাটির সাজেকে আটকা পড়েছেন পাঁচ শতাধিক পর্যটক। একইসঙ্গে অব্যাহত বৃষ্টিতে পাহাড় ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাজেকসহ রাঙ্গামাটির সব পর্যটন স্পটে ভ্রমণ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। বুধবার বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাঘাইছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান। তিনি জানান, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা-বাঘাইহাট-সাজেক সড়কের একাধিক নিচু স্থানে পাহাড়ি ঢলের পানি উঠে যাওয়ায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সাজেকে অবস্থানরত পাঁচ শতাধিক পর্যটক ফিরতে পারছেন না।
তাদের নিরাপদে বিভিন্ন রিসোর্ট, কটেজ ও আবাসন কেন্দ্রে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলায় ২১২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, রাঙ্গামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই ও বাঘাইছড়ি উপজেলার ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ৮০৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
ফেনী প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি ঢলে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এতে জেলার উত্তরাঞ্চলের পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার নদী তীরবর্তী লাখো মানুষের মধ্যে নতুন করে বন্যা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন জরুরি সভা ডেকে আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছে। জেলা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ফেনীতে ৫২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, বৃষ্টির সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে ধেয়ে আসা ঢলের কারণে মুহুরী নদীর পানি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বুধবার সকাল ৯টায় পরশুরাম পয়েন্টে মুহুরী নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৯০ মিটার, যা মাত্র তিন ঘণ্টা আগে সকাল ৬টায় ছিল ৯ দশমিক ৬৫ মিটার। নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বেশ কয়েকটি দুর্বল পয়েন্ট ঝুঁকিতে রয়েছে।
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, টানা প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলা সদরের গঞ্জপাড়াসহ দীঘিনালার কবাখালী ও মেরুং এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অন্তত ছয় শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে দীঘিনালার কবাখালী ও মেরুং সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খাগড়াছড়ি জেলা সদরসহ সারা দেশের সঙ্গে পর্যটন কেন্দ্র সাজেক, বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলার সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর ফলে ওইসব এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনসহ সাধারণ মানুষের যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা জুড়ে ইতিমধ্যে ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় শতাধিক পরিবার এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন।
