সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে দায়ের হওয়া আপিলগুলোর রায় ঘোষণার জন্য আজ দিন ধার্য করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ বুধবার টানা তৃতীয় দিনের শুনানি শেষে রায়ের তারিখ ঘোষণা করেন। পঞ্চদশ সংশোধনীকে কেন্দ্র করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মোট ৩টি আপিল করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চারজন, আরেকটি নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং অপরটি করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। পাশাপাশি হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির করা একটি লিভ টু আপিলও শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়। সোমবার আপিলের শুনানি শুরু হয়।
মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের শুনানি শেষে বুধবার তৃতীয় দিনের কার্যক্রম সম্পন্ন হলে আদালত রায় ঘোষণার জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন।
আদালতে সুজন সম্পাদকসহ চার আপিলকারীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী কারিশমা জাহান ও রিদুয়ানুল করিম। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক এবং মো. মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির। এ ছাড়া মামলায় ইন্টারভেনার হিসেবে অংশ নেয়া একটি সংগঠনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক। পৃথক ইন্টারভেনার হিসেবে আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ। রাষ্ট্রের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্যাহ আল মাসুদ।
পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া: ২০১১ সালের ৩০শে জুন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৪টি বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক দু’টি রিট করা হয়। শুনানি শেষে একই বছরের ১৭ই ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোট বাতিল সংক্রান্ত সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইনের ২০ ও ২১ ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করেন। একইসঙ্গে সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত সংবিধানের ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিভিন্ন পক্ষ লিভ টু আপিল করেন। আপিল বিভাগ অনুমতি দেয়ার পর ৩টি পৃথক আপিল দায়ের হয় এবং ধারাবাহিক শুনানির পর বুধবার শুনানি শেষ হয়। এখন এই বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
পঞ্চদশ সংশোধনীতে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল: পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। একইসঙ্গে অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান সংযোজন করা হয়। সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনর্বহাল করা হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া, তার ৭ই মার্চের ভাষণ, ২৬শে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের পরিবর্তে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান যুক্ত করা হয়।
