ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন যুদ্ধের কাউন্টডাউন?

ফন্ট সাইজ:

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে বুধবার (৮ই জুলাই) ভোরে ইরানের বিভিন্ন স্থানে ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, আন্তর্জাতিক নৌপথে ইরানি হামলার জবাবেই এই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। তবে এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হামলার পর তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সমাপ্তি হয়েছে।
আলোচকরা চাইলে আপাতত শান্তি আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এসব আলোচনাকে “সময়ের অপচয়” বলে মন্তব্য করেছেন।

এ সময় তিনি ইরানের নেতৃত্বকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন। ট্রাম্পের অভিযোগ, ইরানিরা দুষ্ট ও অসুস্থ লোক। এরা ক্যান্সারের মতো এবং আপনারা জানেন আপনাদের কী করতে হবে- শুরুতেই ক্যান্সারকে ছেঁটে ফেলতে হবে।
ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ইউরোপের শেয়ারবাজারে ১ দশমিক ৬ শতাংশ দরপতন হয়, ডলারের মান শক্তিশালী হয় এবং সরকারি বন্ডের সুদের হারও বেড়ে যায়।

৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের: মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের ৮০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, উপকূলীয় রাডার, জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ৬০টিরও বেশি দ্রুতগতির নৌযান।

সেন্টকমের দাবি, হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলরত তিনটি তেলবাহী জাহাজ- এম/টি আল রেকাইয়্যাত, এম/টি ওয়েদিয়ান এবং এম/টি সাইপ্রাস প্রসপারিটি-তেহরানের হামলার শিকার হয়।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরান যদি সমঝোতা লঙ্ঘন অব্যাহত রাখে, তাহলে আরও হামলা চালানো হবে। পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানির ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞাও কার্যকর করেছে ওয়াশিংটন।

ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণ, পাল্টা হামলা: ইরানের গণমাধ্যম জানায়, দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক বন্দর, কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাসের আশপাশ এবং বুশেহর প্রদেশের দু’টি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। কয়েকজন আহত হলেও এখন পর্যন্ত নিহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা পাল্টা হামলায় বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তাদের দাবি, বাহরাইনের মার্কিন পঞ্চম নৌঘাঁটি, পোর্ট সালমান এবং কুয়েতের আলি সালেম বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করারও দাবি করেছে আইআরজিসি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে সমঝোতা স্মারকের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন আখ্যা দিয়েছে। তারা বলেছে, জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় জবাব দিতে তারা দ্বিধা করবে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির মৌলিক ভিত্তিকেই অকার্যকর করে দিয়েছে।

শান্তি আলোচনা অনিশ্চিত: প্রায় তিন সপ্তাহ আগে স্বাক্ষরিত ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারকের আওতায় উভয় পক্ষ শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখবে এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে। কিন্তু নতুন হামলা ও ট্রাম্পের বক্তব্যের পর সেই শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর ওয়াশিংটনের এই প্রতিক্রিয়া যৌক্তিক।
অন্যদিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি), কুয়েত, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিশর ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এসব পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি।
পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে?: দোহা ইনস্টিটিউট অব গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের বিশ্লেষক মুহানাদ সেলুম আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামপ্রতিক হামলা সীমিত পরিসরের ছিল- এমন বার্তাই ওয়াশিংটন দিতে চেয়েছে। তার মতে, প্রযুক্তিগতভাবে ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এখনো কার্যকর রয়েছে। তবে ন্যাটো সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য সেই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সেলুম বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ভিন্ন মাত্রায় শক্তি প্রয়োগ করতে চাইতো, তাহলে তারা অন্য ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতো।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ নৌ কর্মকর্তা হারলান উলম্যান মনে করেন, দুই দেশের জন্যই সংবেদনশীল সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করেছে।
তার ভাষায়, আমার মতে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে উস্কানি দিচ্ছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইরান ইস্যুতে ন্যাটোর ভূমিকার সমালোচনা করেছেন এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্যও জোটটির সমালোচনা করেছেন। আমার ধারণা, ইরান এখন হামলা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে বিভাজন আরও গভীর করতে চাইছে।
তাদের ধারণা, দেশ জুড়ে চলমান শোকানুষ্ঠানের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ সীমিত থাকবে। উলম্যান আরও বলেন, আগস্টের নির্ধারিত সময়সীমার আগে আরও বেশি সময় নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরির কৌশলও ইরানের থাকতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি যুদ্ধের দিকে গড়াক বা শান্তির পথে এগোক- আমার ধারণা, উভয় পক্ষই শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করবে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন