দীর্ঘদিন ধরে ভারতে ধনীদের দান-অনুদানের বড় একটি অংশ মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে গেলেও, সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দেশটির শীর্ষ ধনকুবের ও শিল্পপতিরা এখন মৌলিক বিজ্ঞান, গবেষণা এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ শুরু করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভারতীয় বংশোদ্ভূত পদার্থবিদ জৈনেন্দ্র জৈন, যিনি ২০২৫ সালের মর্যাদাপূর্ণ উলফ পুরস্কারের যৌথ বিজয়ী, একটি অপ্রত্যাশিত ফোনকল পান ভারতের রিয়েল এস্টেট খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তা অভিষেক লোধার কাছ থেকে।
মুম্বাইয়ের আরব সাগরের তীরে অবস্থিত বিলাসবহুল ট্রাম্প টাওয়ার নির্মাতা লোধা গ্রুপের প্রধান অভিষেক লোধা তাকে মুম্বাইয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া নতুন লোধা থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হওয়ার প্রস্তাব দেন।
বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জৈনেন্দ্র জৈন বলেন, আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণকারী একজন ব্যবসায়ী হঠাৎ মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণায় অর্থায়ন করতে চান- এটা যুক্তরাষ্ট্রে স্বাভাবিক হলেও ভারতে খুব একটা দেখা যায় না।
এদিকে কয়েক সপ্তাহ পর ভারতের অন্যতম প্রাচীন শিল্পগোষ্ঠীর উত্তরসূরি রাজীব বাজাজ নারী প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৃত্তি কর্মসূচি চালু করেন। এর আওতায় নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়া ছাত্রীদের শিক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ৮ লাখ রুপি পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ ভারতের ধনী শ্রেণির জনহিতৈষণামূলক কর্মকাণ্ডে একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন। যেখানে আগে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান ছিল প্রধান প্রবণতা, এখন বিজ্ঞান, গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের দাতব্য অনুদানের প্রায় অর্ধেকই এখনও মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির একাধিক শীর্ষ ব্যবসায়ী বিজ্ঞান গবেষণায় বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন।
ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা কৃষ গোপালকৃষ্ণন মস্তিষ্কবিষয়ক গবেষণায় অর্থায়ন করছেন। ওষুধশিল্প উদ্যোক্তা কিরণ মজুমদার-শ ২০২২ সালে অত্যাধুনিক জীববিজ্ঞান গবেষণার জন্য একটি বিশেষ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া বেঙ্গালুরুর অন্তত অর্ধডজন প্রযুক্তি খাতের বিলিয়নিয়ার রোবোটিক জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে শুরু করে বহুমুখী চিকিৎসা গবেষণা পর্যন্ত নানা প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন।
অভিষেক লোধা বিবিসিকে বলেন, কোনো মহান দেশ শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়া এগিয়ে যেতে পারেনি। ভারতের মেধাবী মানুষের অভাব নেই, কিন্তু গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।
তিনি জানান, নতুন গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে আগামী ৮ থেকে ১০ বছরে ১০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তার আশা, এখানে গবেষকরা দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমানের গবেষণা করবেন, যা ভবিষ্যতে উদ্ভাবন, প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং নতুন শিল্পের বিকাশে সহায়তা করবে।
এই বিনিয়োগ এমন সময়ে আসছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্সসহ আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত পিছিয়ে পড়ছে বলে উদ্বেগ বাড়ছে।
ভারতের গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খাতে ব্যয় বর্তমানে জিডিপির মাত্র ০.৬ থেকে ০.৭ শতাংশ, যা চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম। এছাড়া গবেষণায় বেসরকারি খাতের অবদান মাত্র ৩৬ শতাংশ, যেখানে উন্নত অর্থনীতিগুলোতে এই হার ৭০ শতাংশেরও বেশি।
কিরণ মজুমদার-শ বলেন, বিশ্বের হার্ভার্ড, এমআইটি কিংবা স্ট্যানফোর্ডের মতো বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাতব্য সহায়তার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে। কিন্তু ভারতে এতদিন ধরে ধারণা ছিল, এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কেবল সরকারের।
তিনি মনে করেন, এখন সেই ধারণা বদলাতে শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীনতার পর টাটা গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রের ধাঁচে বিজ্ঞান গবেষণায় অর্থায়নের পথ দেখিয়েছিল। তাদের উদ্যোগেই টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (টিআইএফআর) এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স (আইআইএসসি)-এর মতো প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ভিত্তি পায়। তবে এরপর দীর্ঘ সময় বিজ্ঞান গবেষণায় বেসরকারি দান কমে যায়। এখন আবার সেই ধারা ফিরে আসছে।
দাতব্য সংস্থা দাসরা-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা নীরা নন্দী বলেন, নতুন প্রজন্মের ধনী উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক এবং ফলাফলমুখী হওয়ায় তারা বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী।
তবে তিনি বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের তুলনায় বিজ্ঞান গবেষণায় দাতব্য অর্থায়ন এখনও অনেক কম। যদিও ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতীয় ধনী পরিবারগুলোর অতিরিক্ত ১৪ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার দানের সম্ভাবনা রয়েছে। এর কতটা বিজ্ঞান গবেষণায় যাবে, তা নির্ভর করবে শক্তিশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ গড়ে ওঠার ওপর।
কিরণ মজুমদার-শয়ের মতে, বিশেষ করে ওষুধশিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগ করা উচিত।
তিনি বলেন, ভারতের ওষুধ কোম্পানিগুলো এখনও যুগান্তকারী গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছে না। নতুন ওষুধ উদ্ভাবনই তাদের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা, আর এজন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও বেশি অর্থায়ন জরুরি।
অভিষেক লোধা মনে করেন, ভারতের অর্থনীতি যত এগোবে, ততই জনহিতৈষণার ধরনও বদলাবে।
তার ভাষায়, একসময় সমাজের মৌলিক চাহিদা পূরণে দান ছিল অগ্রাধিকার। এখন সেই ধারা বদলে উৎকর্ষ, জ্ঞান ও উদ্ভাবনের জন্য দানের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।
