নদীর শান্ত পানিতে ভাসছিল এক নবজাতক কন্যাশিশুর মরদেহ। কোমরে শক্ত করে বাঁধা একটি ভারী ইট, যেন সব অপরাধের প্রমাণ চিরতরে পানির গভীরে তলিয়ে দেয়ার এক নৃশংস চেষ্টা। গত ২৯শে জুন নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলার কালিহর নদী থেকে যখন লাশটি উদ্ধার করা হয়, তখন পুরো এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই নির্মমতার নেপথ্যে যে আরও বড় এক অন্ধকার, পৈশাচিক এবং বুকফাটা আর্তনাদের গল্প লুকিয়ে ছিল। তা নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচন করেছে পূর্বধলা থানা পুলিশ। ইট বাঁধা লাশ উদ্ধারের সূত্র ধরে বেরিয়ে এসেছে প্রতিবেশীর লোলুপ দৃষ্টি এবং ১২ বছরের এক শিশুর ওপর মাসের পর মাস চলা পাশবিক নির্যাতনের লোমহর্ষক কাহিনী। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯শে জুন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পূর্বধলা থানার কালিহর মাইজপাড়া এলাকায় কালিহর নদীতে স্থানীয়রা একটি নবজাতকের লাশ ভাসতে দেখেন।
খবর পেয়ে পূর্বধলা থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। এ সময় দেখা যায়, সদ্যোজাত কন্যাশিশুটির শরীরে একটি কালো শার্ট এবং রশি দিয়ে একটি ইট বাঁধা। ঘটনাটি অত্যন্ত রহস্যজনক ও স্পর্শকাতর হওয়ায় জেলা পুলিশ ও পূর্বধলা থানার একটি চৌকস দল ঘটনার তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিশ্বস্ত সোর্সের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, এটি কেবল কোনো নবজাতকের লাশ ফেলার সাধারণ ঘটনা নয়, এর পেছনে রয়েছে এক ভয়াবহ অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা। ঘটনার মূলহোতা হিসেবে উঠে আসে স্থানীয় কোনাকালিহর মাইজপাড়া গ্রামের আব্দুল হামিদের ছেলে সাজন মিয়ার (২৫) নাম। এরপরই পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে সাজনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সাজন স্বীকার করেছে তার সেই অন্ধকার ও নারকীয় অপরাধের কথা।
ভিকটিম ১২ বছরের এক শিশু, যার মা স্থানীয় একটি ক্লিনিকে ঝাড়ুদার হিসেবে কাজ করেন। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মা থাকতেন বাড়ির বাইরে। আর এই সুযোগটিকেই বেছে নেয় সাজন। আনুমানিক সাত মাস পূর্বে এক সকালে বাড়ি ফাঁকা থাকার সুযোগে ঘরে ঢুকে ১২ বছরের ওই শিশুটিকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। প্রথম দিনের পর থেকেই শিশুটিকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেখাতে শুরু করে। মা বাড়ি না থাকার সুযোগে প্রতি দুই-তিন দিন পর পরই শিশুটির ওপর চালাতো পাশবিক নির্যাতন। শিশুটির শারীরিক পরিবর্তনের বিষয়টিও পরিবারের নজরে আসেনি। ?গত ২৮শে জুন সকাল থেকেই শিশুটি পেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছিল।
মা গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা ভেবে ওষুধ খাইয়ে কাজে চলে যান। কিন্তু মধ্যরাতে ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। বারবার বাথরুমে যাওয়া-আসার একপর্যায়ে রাত আনুমানিক ১টার দিকে বসতঘরের প্রস্রাবখানার পাশেই একটি মৃত কন্যা সন্তান প্রসব করে ১২ বছরের সেই শিশু। ভয়ার্ত ও রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটি তার মাকে সব কথা খুলে বলে। মেয়ের মুখে এই নৃশংসতার গল্প শুনে মা স্তব্ধ হয়ে সাজনকে ডেকে এনে জবাবদিহি চান। অপরাধের কথা স্বীকার করলেও সাজন উল্টো পরিবারটিকে হুমকি-ধমকি দিতে শুরু করে। ঘটনা জানাজানি হলে সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। এই ভয় দেখিয়ে এবং জোরপূর্বক ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে রাতারাতি ছক কষে সাজন। ভোর ৪টার দিকে নিজের একটি কালো শার্ট দিয়ে মৃত নবজাতকের শরীর পেঁচিয়ে, রশি দিয়ে ভারী ইট বেঁধে অজ্ঞাতনামা কয়েকজন সহযোগীর সাহায্যে লাশটি কালিহর নদীতে ফেলে আসে। ভেবেছিল, নদীর গভীরেই হয়তো ডুবে থাকবে তার সব পাপ।
এ ব্যাপারে পূর্বধলা থানার ওসি আব্দুল্লাহ্ আল মামুন বলেন, ঘটনার পর পরই তদন্ত করে সাজনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে তার অপরাধ স্বীকার করেছে। গুম ও খুনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া মঙ্গলবার রাতে ধর্ষিতার বাবা বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে আরও একটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোসহ অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে।
