বাজারে ঢুকলেই বোঝা যায় অর্থনীতির বাস্তবতা। চাল, ডাল, তেল, মাছ, ডিম কিংবা সবজির দামই এখন সাধারণ মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় সূচক। গত কয়েক বছরে আয় কিছুটা বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুত। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে পড়েছে। এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের অভিমত- শুধু উৎপাদন বাড়িয়ে নয়, উৎপাদিত খাদ্য দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পারলেই মিলবে স্থায়ী সমাধান।
বাজেটে কৃষি ভর্তুকি, খাদ্যশস্য সংগ্রহ, কৃষিঋণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের সক্ষমতা জোরদারের উদ্যোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষির আধুনিকীকরণ, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি, গবেষণা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াসিন বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও বাজারমুখী খাতে রূপান্তর করা হচ্ছে। উন্নত বীজ, কৃষি গবেষণা, যান্ত্রিকীকরণ, সৌরচালিত সেচ, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি এবং উৎপাদন-পরবর্তী অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ অপরিহার্য।
একইভাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তায় মৎস্যখাতের ভূমিকা আরও বাড়াতে সরকার আধুনিক কোল্ড-চেইন, ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার, আন্তর্জাতিক মানের প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অর্জনকে মূল্য সংযোজন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের শক্তিতে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু বাজার তদারকি বা আমদানি বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। প্রয়োজন উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো ভ্যালু চেইনের আধুনিকায়ন। কোল্ড-চেইন, পোস্ট-হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট, আঞ্চলিক সংগ্রহ কেন্দ্র, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমেই খাদ্যের অপচয় কমানো এবং বাজারকে স্থিতিশীল করা সম্ভব।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড-চেইন, লজিস্টিকস ও মৎস্যখাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক নীতি সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সহজ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এসব খাত আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিনে পরিণত হতে পারে।
এদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএসইআর বলছে, খাদ্য নিরাপত্তার আলোচনায় মৎস্যখাতকে আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির মাছ উৎপাদনকারী দেশ হলেও বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারেনি। আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, ট্রেসেবিলিটি, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ, কোল্ড-চেইন এবং দক্ষ রপ্তানি ব্যবস্থার অভাবে বিপুল সম্ভাবনা অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। সিএসইআর আরও মনে করে, ব্লু ইকোনমিকে আগামী দশকের কৌশলগত প্রবৃদ্ধির খাত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, অফশোর অ্যাকুয়াকালচার, সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক মেরিন এক্সপোর্ট হাব গড়ে তুলতে পারলে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংস্থাটি মনে করে ২০২৬-২৭ সালের বাজেট খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে সেই ভিত্তিকে কার্যকর ফলাফলে রূপ দিতে হলে কৃষি ও মৎস্যকে শুধু ভর্তুকিনির্ভর সামাজিক খাত হিসেবে নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর, উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক এবং রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কোল্ড-চেইন, গবেষণা, উদ্ভাবন, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্লু ইকোনমির সমন্বিত বিকাশ ঘটাতে পারলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও কমবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি টেকসই প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি পাবে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে ধান, সবজি ও মাছের উৎপাদন বেড়েছে; কিন্তু কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না, আবার ভোক্তাকেও বেশি দামে কিনতে হয়। এর প্রধান কারণ উৎপাদন নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা। প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল, সবজি ও মাছ বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ, সংগ্রহ কেন্দ্র ও আধুনিক পরিবহন না থাকায় কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি খাদ্য মূল্যস্ফীতিও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সিএসইআরের বিশ্লেষণ: গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের মানুষ সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। আয় কিছুটা বেড়েছে কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুত। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তও এখন খাদ্য ব্যয়ের চাপ অনুভব করছে। এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করা। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই খাদ্য নিরাপত্তাকে কেবল সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
এবারের বাজেটে কৃষি, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কৃষি ভর্তুকি অব্যাহত রাখা, খাদ্যশস্য সংগ্রহ বৃদ্ধি, কৃষিঋণ সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ধরে রাখার উদ্যোগ ইতিবাচক। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন এবং কৃষিকে আরও টেকসই করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক, কারণ দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বাজারে খাদ্যের কার্যকর সরবরাহ বৃদ্ধি করা, শুধু প্রশাসনিক বাজার তদারকি নয়।
সিএসইআর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট প্রস্তাবনায়ও একই ধরনের নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছিল। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিল যে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু ভর্তুকি বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; বরং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজার অবকাঠামোর উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। এ কারণেই সিএসইআর কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, কোল্ড-চেইন অবকাঠামো, আধুনিক সাপ্লাই চেইন, পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিমুখী বিনিয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিল।
বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে সিএসইআর এর একাধিক সুপারিশের সুস্পষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; তবে নীতিগত অঙ্গীকারকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে হলে কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সিএসইআর মনে করে, খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে কেবল বাজার তদারকি বা আমদানি বাড়ানোর মাধ্যমে পাদন সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পুরো খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানো। অর্থাৎ, খাদ্য নিরাপত্তাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্যালু-চেইনভিত্তিক অর্থনৈতিক কৌশ কৌশল হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশে কৃষি নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত উৎপাদনের কথা বলা হয়। কিন্তু আজকের হলো উৎপাদিত খাদ্য কতটা দক্ষতার পৌঁছাচ্ছে। দেশে ধান, সবজি ও মাছের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও বাজারে খাদ্যের দাম অস্থিতিশীল। কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না, আবার ভোক্তাও সাশ্রয়ী দামে খাদ্য কিনতে পারেন না। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে, সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু উৎপাদনে নয়; বরং সরবরাহব্যবস্থার অদক্ষতায়। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফল, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য মাঠ থেকে বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। কোথাও পর্যাপ্ত হিমাগার নেই, কোথাও আধুনিক সংগ্রহ কেন্দ্র নেই, কোথাও আবার দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থার কারণে কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারে না। এর ফলে কৃষক উৎপাদনের মৌসুমে লোকসান গোনেন, আর কয়েক সপ্তাহ পর একই পণ্য কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন সাধারণ ভোক্তা। এই অদক্ষতা শুধু কৃষকের ক্ষতি করে না; এটি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকেও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।এই জায়গাতেই প্রয়োজন একটি মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন। কৃষি খাতে ভর্তুকি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত উৎপাদন-পরবর্তী অবকাঠামোতে। কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক কোল্ড-চেইন, আঞ্চলিক সংগ্রহ কেন্দ্র, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং ডিজিটাল সরবরাহ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ ছাড়া খাদ্য মূল্যস্ফীতি স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সৌরচালিত সেচব্যবস্থা, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি, উন্নত বীজ, কৃষি গবেষণা এবং জলবায়ু সহনশীল ফসল উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় উৎপাদনশীলতা ধরে রাখাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে খাদ্য নিরাপত্তাকে যদি কেবল ধান, চাল বা গমের উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে বাস্তব চিত্রের একটি বড় অংশ উপেক্ষিত থেকে যাবে। বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো মৎস্যখাত। প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস মাছ, লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতের সঙ্গে যুক্ত এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিও এটি। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টি-এই তিনটি বিষয়েই মৎস্যখাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির মাছ উৎপাদনকারী দেশ। ইলিশ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি একটি অর্থনৈতিক সম্পদ, আর চিংড়ি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পরিচিত রপ্তানি পণ্য। তবুও বাস্তবতা হলো, আমরা এখনো উৎপাদনের সাফল্যকে
কাঙিক্ষত অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপান্তর করতে পারিনি। মাছ উৎপাদনে সাফল্য থাকলেও মূল্য তিকরণ, সংরক্ষণ ও রপ্তানি অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রে জেলে ন্যায্য মূল্য পান না আবার শহরের ভোক্তা বেশি দামে মাছ কিনতে সংযোজন, আন্তর্জাতিক মানের প্রক্রিয়াজাতকরণ বাধ্য হন। কষিপণ্যের মতো এখানেও সমস্যার মূল জায়গা উৎপাদন নয়; বরং বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার অদক্ষতা।
সিএসইআর মনে করে, কৃষিতে যেমন কোল্ড-চেইন ও পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ, মৎস্যখাতে এর প্রয়োজন আরও বেশি। মাছ অত্যন্ত দ্রুত নষ্ট হওয়া একটি খাদ্যপণ্য। উৎপাদনের পর যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিবহন নিশ্চিত না হলে কার্যকর সরবরাহ কমে যায় এবং বাজারে মূল্যচাপ সৃষ্টি হয়। তাই জাতীয় পর্যায়ে আধুনিক কোল্ড-চেইন নেটওয়ার্ক, ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার, সংরক্ষণাগার, মানসম্মত পরিবহন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের ফিশ প্রসেসিং জোন গড়ে তোলাকে এখন অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে শক্তি-সাশ্রয়ী চাষপদ্ধতি, উন্নত হ্যাচারি, গবেষণাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর মৎস্যচাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে আরও স্থিতিশীল করবে।
খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ কেবল কৃষিজমিতে নয়, সমুদ্রেও নিহিত। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা এবং সামুদ্রিক সম্পদ এখনো পর্যাপ্তভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত হয়নি। ব্লু ইকোনমিকে যদি জাতীয় প্রবৃদ্ধির একটি কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তাহলে এটি আগামী দশকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হতে পারে। গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, অফশোর অ্যাকুয়াকালচার, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যভিত্তিক গবেষণা এবং উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন শিল্প ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
সিএসইআর মনে করে, আগামী দশকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কৌশলে ব্লু ইকোনমিকে তৈরি পোশাক শিল্পের পর সম্ভাবনাময় দ্বিতীয় রপ্তানি ইঞ্জিন হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কৃষি ও মৎস্যকে শুধু ভর্তুকিনির্ভর সামাজিক খাত হিসেবে না দেখে যদি উচ্চমূল্য সংযোজন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, আন্তর্জাতিক মানের প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতে একটি নতুন প্রবৃদ্ধির অধ্যায় সূচিত হবে। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ শুধু কত খাদ্য উৎপাদন হলো তার ওপর নির্ভর করবে না: নির্ভর করবে সেই খাদ্য কতটা দক্ষভাবে সংরক্ষণ পরিবহন আর ভোক্তার কাছে পৌঁছানো গেল তার ওপরও। এই বাস্তবতায় মৎস্যখাতকে কৃষির উপখাত হিসেবে না দেখে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনার একটি কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিসংগত। সেই বিবেচনায় ২০২৬-২৭ সালের বাজেট একটি ভিত্তি তৈরি করেছে বলা যায়; এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই নীতিকে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ফল নিশ্চিত করা।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৬-২৭ সালের বাজেট খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় একটি ইতিবাচক নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এই ভিত্তিকে সফলতায় রূপ দিতে হলে কৃষি ও মৎস্য উভয় খাতেই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা, কোল্ড-চেইন অবকাঠামো, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং রপ্তানিমুখী মূল্য সংযোজনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কৃষি ও মৎস্যকে কীভাবে দেখি তার ওপর। যদি এগুলোকে কেবল ভর্তুকিনির্ভর খাত হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কিন্তু যদি এগুলোকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানের কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা শুধু নিশ্চিতই হবে না; বরং কৃষি, মৎস্য ও ব্লু ইকোনমিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে টেকসই প্রবৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
