‘এখন থেকে কেপ ভার্দেকে মানচিত্রে খুঁজে বের করতে হবে না’

‘এখন থেকে কেপ ভার্দেকে মানচিত্রে খুঁজে বের করতে হবে না’

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম আসরেই ফুটবল বিশ্বের মন জয় করে নিলো কেপ ভার্দে। গ্রুপ পর্বে ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য রুখে দেয়া, এরপর উরুগুয়ের জালে প্রথম গোল জড়িয়ে বিশ্বকে চমকে দেয় তারা। সবশেষ শেষ ৩২-এ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত কাঁপিয়েই দিলো আফ্রিকার দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশটি। বিদায় নিলেও ব্লু শার্কদের এই অবিশ্বাস্য যাত্রা ফুটবল ইতিহাসে আজীবন অমলিন থাকবে।

মায়ামিতে গতকাল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ৩-২ গোলে হেরে আসর থেকে বিদায় নিয়েছে ৬৭ নম্বরে থাকা দলটি। তবে হারলেও তাদের লড়াকু মানসিকতা আর অদম্য ফুটবলকে এই বিশ্বকাপের আসল গল্প বলছেন বিশ্লেষকরা। ম্যাচ শেষে সাবেক ইংলিশ রাইট-ব্যাক গ্যারি নেভিল আইটিভি-কে বলেন, ‘একটি আন্ডারডগ দলের পক্ষ থেকে এটি আমার দেখা অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স। ফুটবলাররা কাঁদছে কারণ তারা এখনই বাড়ি ফিরতে চায় না, বিশ্বমঞ্চের এই জাদুকরী মুহূর্তটাকে তারা আজীবন ধরে রাখতে চায়।’ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে লিওনেল মেসির গোলে পিছিয়ে পড়েও সমতায় ফেরে কেপ ভার্দে। অতিরিক্ত সময়ে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের গোলে আর্জেন্টিনা আবার এগিয়ে যায়। পরে সিডনি লোপেস কাবরালের চোখধাঁধানো এক স্ট্রাইকে ফের ম্যাচে ফেরে তারা। তবে শেষ পর্যন্ত ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড ডিফেন্ডার ডিনে বোর্হেসের হাতে লেগে জালে জড়ালে আত্মঘাতী গোলে হৃদয় ভাঙে আফ্রিকার দলটির। ম্যাচের পর কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা গর্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করেছি, ছোট দেশ হলেও আমরা বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে চোখে চোখ রেখে লড়তে পারি।’ দলের ডিফেন্ডার রবার্তো লোপেসের ভাষ্য, ‘এই বিশ্বকাপের পর মানচিত্রে কেপ ভার্দে কোথায়, তা আর কাউকে খুঁজে বের করতে হবে না। আমরা নিজেদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছি।’

কিংবদন্তিদের পাশে ভোজিনহা
চলতি বিশ্বকাপে যদি নতুন কোনো গ্লোবাল আইকন তৈরি হয়ে থাকেন, তবে তিনি কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ভোজিনহা। পর্তুগিজ দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শাভেসের সাথে চুক্তি শেষ হওয়া এই ‘ফ্রি এজেন্ট’ এখন পুরো টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় তারকা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এক ম্যাচে ৮টি দুর্দান্ত সেভসহ পুরো টুর্নামেন্টে মোট ১৮টি সেভ করেছেন এই প্রবীণ গোলকিপার। চলতি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ সেভের তালিকায় কুরাসাওয়ের এলোয় রুম (২০) এবং প্যারাগুয়ের অরল্যান্ডো গিলের (১৯) পরেই তার অবস্থান। অপ্টা-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৪০ বা তার বেশি বছর বয়সে ভোজিনহার চেয়ে বেশি সেভ করার কীর্তি আছে আর মাত্র দুজনের। তারা ইংল্যান্ডের পিটার শিলটন (১৯৯০ বিশ্বকাপে ২৮টি) এবং ইতালির দিনো জফ (১৯৮২ বিশ্বকাপে ২৭টি)।
সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট ভোজিনহার পারফরম্যান্সকে ‘হিরো এনার্জি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে গ্যারি নেভিলের দাবি, ‘বিশ্বকাপের এমন পারফরম্যান্সের পর খুব দ্রুতই ইউরোপের বড় কোনো ক্লাব ভোজিনহাকে দলে ভেড়াবে। ও এত শান্ত আর গোছানো, এতদিন ও কোথায় লুকিয়ে ছিল!’

‘তোমাকে নিয়ে সবার গর্বিত হওয়া উচিত’, ভোজিনহাকে বলেছেন মেসি
ম্যাচ জুড়ে আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ একাই নস্যাৎ করে দিয়েছেন ভোজিনহা। লিওনেল মেসিরই ৫টি শট রুখে দিয়েছেন তিনি। ম্যাচ হারলেও মাঠ ছাড়ার আগে এক আবেগঘন মুহূর্তে ভোজিনহাকে বুকে জড়িয়ে নেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। মেসির সেই প্রতিক্রিয়ার কথা জানিয়ে ভোজিনহা বলেন, “ম্যাচ শেষে আমি নিজেই মেসির দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম। ও আমাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল এবং বললো- ‘তুমি দুর্দান্ত খেলেছ। তোমাদের মানুষদের আজ তোমাকে নিয়ে গর্বিত হওয়া উচিত।’ লিও মেসির মতো একজন কিংবদন্তির মুখ থেকে এমন কথা শোনা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ও আবেগপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে থাকবে।” মেসির প্রশংসার জবাবে তিনি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘ধন্যবাদ লিও, তুমিই সর্বকালের সেরা।’ এরপর কেপ ভার্দের এই গোলকিপার মেসির জার্সিটি বদল করার অনুরোধ জানালে মেসি সানন্দে রাজি হন। জানান, ম্যাচ পরবর্তী সাক্ষাৎকার শেষ করে টানেলের ভেতরেই তিনি নিজের জার্সিটি ভোজিনহাকে দিয়ে দেবেন। বিদায়বেলায় আবেগাপ্লুত ভোজিনহা বলেন, ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে আমরা আজ সমানে সমানে লড়েছি, এমনকি ম্যাচটা জেতার সুযোগও ছিল আমাদের। আমরা আজ গর্বিত। এই স্মৃতি আজীবন আমার হৃদয়ে খোদাই করা থাকবে। আশা করি, আমাদের এই লড়াই দেখে দেশের তরুণ প্রজন্ম আগামীতে বিশ্বের সেরা সেরা লীগে খেলার অনুপ্রেরণা পাবে।’


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন