বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবার অন্যরকম এক রেকর্ড লেখা হলো। গোলের হিসেবে যেখানে আলোচনায় মেসি-এমবাপ্পেরা, সেখানে নীরবে ইতিহাস গড়ে ফেললো আত্মঘাতী গোল। চলতি বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত মোট ১৪টি আত্মঘাতী গোল হয়েছে। এই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ২০১৮ বিশ্বকাপের ১২ আত্মঘাতী গোলের রেকর্ড।
১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের প্রথম আসর থেকেই আত্মঘাতী গোলের দেখা মিলেছে। তবে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ আত্মঘাতী গোলের কারণে বিশেষ হয়ে আছে। গ্রুপ পর্বের মাঝামাঝি সময়ে একের পর এক আত্মঘাতী গোলের কারণে সেই আসরকে ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর বিশ্বকাপ বলে আখ্যা দেয় ওয়াশিংটন পোস্ট। কারণ এর আগের বিশ্বকাপগুলোতে আত্মঘাতী গোলের সংখ্যা থাকতো তিন থেকে ছয়ের মধ্যে। এমনকি ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মাত্র দুটি আত্মঘাতী গোল হয়েছিল। সেই তুলনায় এবারের ১৪ সংখ্যাটা রীতিমতো চমকে দেয়ার মতো।
টুর্নামেন্টের মোট ১৪টি আত্মঘাতী গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছিল গ্রুপ পর্বে। শুক্রবার আরো দুটি আত্মঘাতী গোল যোগ হওয়ার পরই ভেঙে যায় আগের রেকর্ড। এদিও প্রথম আত্মঘাতী গোলটি আসে মিশরের ডিফেন্ডার মোহামেদ হানির পা থেকে। অস্ট্রেলিয়ার একটি ফ্রি-কিক থেকে যিনি ছিলেন বলে শেষ স্পর্শকারী। এতে সমতায় ফেরে অস্ট্রেলিয়া, ম্যাচ শেষ পর্যন্ত গড়ায় টাইব্রেকারে, যেখানে সহজেই জয় পায় মিশর। গ্রুপ পর্বে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১-১ ড্র হওয়া ম্যাচেও একই কাজ করেছিলেন হানি। এতে একই বিশ্বকাপে দুটি আত্মঘাতী গোল করা প্রথম খেলোয়াড় হয়ে গেলেন তিনি। আর্জেন্টিনার কেপ ভার্দের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয়েও নির্ধারক গোলটি ছিল আত্মঘাতী। শুরুতে গোলটি মেসির কর্নার থেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর নামে লেখা হলেও, পরে দেখা যায় গোলরক্ষক ভোজিনহাকে ফাঁকি দেওয়ার আগে বলে শেষ স্পর্শ করেছিলেন কেপ ভার্দের দিনেই বোর্হেস। এই গোলই রেকর্ডকে নিয়ে যায় ১৪-তে। আত্মঘাতী গোলের এই ধারা চলছে টুর্নামেন্টের শুরু থেকে। এর থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান যুক্তরাষ্ট্র। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ৪-১ গোলের বড় জয়ের পথে আত্মঘাতী গোলের খাতা খোলেন প্যারাগুয়ের দামিয়ান বোবাদিয়া। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্ডার ক্যামেরন বার্জেসের পা থেকে আসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম গোল। এক আসরে দুটি আত্মঘাতী গোল থেকে সুবিধা পাওয়া একমাত্র দল যুক্তরাষ্ট্র, এই তালিকায় তাদের সঙ্গী শুধু ২০১৪ বিশ্বকাপের ফ্রান্স। মেক্সিকোর মানুয়েল রোসাস ইতিহাসের প্রথম আত্মঘাতী গোলদাতা। সবচেয়ে কম বয়সে এই কীর্তি গড়েন তিনি। ১৯৩০ সালের উদ্বোধনী আসরে এ রেকর্ডে নাম লেখান রোসাস। বিশ্বকাপের ফাইনালে একমাত্র আত্মঘাতী গোল ক্রোয়েশিয়ার মারিও মানজুকিচের। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে তিনি আত্মঘাতী গোল করেন। দল হিসেবে মেক্সিকো ও মরক্কো যৌথভাবে শীর্ষে আছে। দুই দলেরই ঝুলিতে চারটি করে আত্মঘাতী গোল। এমন গোল বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ ৪৮ দলের ফরম্যাট। দল বেশি মানে ম্যাচও বেশি। আর ম্যাচ বেশি হলে স্বাভাবিকভাবে এ ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশি তৈরি হয়। এছাড়া বর্ধিত ফরম্যাটের কারণে দলগুলোর মধ্যে শক্তির পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
দেখা গেছে, বেশিরভাগ আত্মঘাতী গোল এসেছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলগুলোর কাছ থেকে। যেমন প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দে, জর্ডান কিংবা উজবেকিস্তান, অথবা কাতারের মতো আন্ডারডগ দল। যারা গ্রুপ পর্বে দুটি আত্মঘাতী গোল করে। মূলত হাই-প্রেসিং আক্রমণাত্মক দলগুলোর সেট-পিস কিংবা কাউন্টার অ্যাটাক ঠেকাতে গিয়েই এসব ভুল হয়েছে বেশি। সামনে অনেকগুলো নকআউট ম্যাচ বাকি। যেভাবে লড়াই হচ্ছে, তাতে আত্মঘাতী গোলের এই সংখ্যা ব বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।
