“জ্ঞান, ঈমান ও উত্তম চরিত্রে আজীবন শিক্ষাযাত্রার প্রথম মাইলফলক উদযাপন””—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল মিরপুরের কিন্ডারগার্টেন গ্র্যাজুয়েশন সেরিমনি ২০২৫–২০২৬ শনিবার (৪ জুলাই) সকাল ১০টায় মিরপুর ডিওএইচএসের মিরপুর কালচারাল কনভেনশন হল-এ অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে ১৫০ জন কেজি শিক্ষার্থীর আনুষ্ঠানিক গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন হয়। এ উপলক্ষে প্রায় ৭০০ জন অভিভাবক, অতিথি, শিক্ষাবিদ, শুভানুধ্যায়ী ও স্কুল পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে মিলনমেলায় পরিণত হয় পুরো অনুষ্ঠানস্থল। বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিশুদের শিক্ষাজীবনের প্রথম একাডেমিক মাইলফলক উদযাপিত হয়।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিয়ারসন পিএলসি-এর বাংলাদেশ ও নেপালের রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার লিটন আবদুল্লাহ, ব্রিটিশ কাউন্সিল-এর ইংলিশ অ্যান্ড এক্সামস বিভাগের অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার আনিকা বুশরা, একই বিভাগের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার নাজমুস সাকিব আহমেদ, অক্সফোর্ড একিউএ -এর বাংলাদেশ ও নেপালের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. শাহিন রেজা, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও জনবক্তা শাইখ ড. প্রফেসর এবিএম হিযবুল্লাহ, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ শাইখ সানা উল্লাহ আযহারী, শাইখ রফিকুল্লাহ মাদানী এবং শাইখ শরাফত উল্লাহ নাদভী।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও জনবক্তা এবং এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল মিরপুর-এর অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্য মজিদুল হক লিটন, অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্য আফজালুল ইসলাম, এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল মিরপুর-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দা মনিকা সোহাগ এবং বিদ্যালয়ের চিফ অ্যাডভাইজর ও বিশিষ্ট ইসলামি স্কলার শাইখ প্রফেসর মোখতার আহমদ।
অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ কাউন্সিল-এর ইংলিশ অ্যান্ড এক্সামস বিভাগের অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার আনিকা বুশরা বলেন, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো প্রারম্ভিক শিক্ষা। তিনি শিক্ষার্থীদের ভাষা দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিদ্যালয়ের আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন এবং অভিভাবকদের সক্রিয় অংশীদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
একই প্রতিষ্ঠানের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার নাজমুস সাকিব আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা শুধু ভালো ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সহযোগিতা ও আজীবন শেখার মানসিকতা গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল মিরপুরের সমন্বিত শিক্ষা উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
অক্সফোর্ড একিউএ -এর বাংলাদেশ ও নেপালের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. শাহিন রেজা বলেন, একটি শক্তিশালী ভিত্তিই ভবিষ্যতের সফলতার চাবিকাঠি। তিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষার মাধ্যমে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করে তোলার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান।
পিয়ারসন পিএলসি-এর বাংলাদেশ ও নেপালের রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার লিটন আবদুল্লাহ বলেন, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সফল হতে হলে শিশুদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সহযোগিতা এবং ডিজিটাল সক্ষমতার মতো দক্ষতাও অর্জন করতে হবে। তিনি আন্তর্জাতিক মানের পাঠক্রমের সঙ্গে নৈতিক ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয়ের জন্য বিদ্যালয়কে অভিনন্দন জানান।
বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও জনবক্তা শাইখ ড. প্রফেসর এবিএম হিযবুল্লাহ বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষা হলো ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তিনি বলেন, কুরআন, সুন্নাহ, উত্তম চরিত্র এবং আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ে বেড়ে ওঠা শিশুরাই একটি আলোকিত সমাজ গঠনে নেতৃত্ব দেবে। তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য দোয়া করেন এবং অভিভাবকদের সন্তানদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আরও যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানান।
বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও জনবক্তা এবং এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল মিরপুরের শরিয়াহ ও ইসলামিক সেন্টারের লিড স্কলার শাইখ প্রফেসর মোখতার আহমদ বলেন, শিশুরা আল্লাহর অমূল্য আমানত। তাদের হৃদয়ে ছোটবেলা থেকেই ঈমান, শিষ্টাচার, সত্যবাদিতা, মানবিকতা ও জ্ঞানার্জনের ভালোবাসা গড়ে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব। তিনি এভারোস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল মিরপুরের শিক্ষা দর্শনের প্রশংসা করেন।
শাইখ সানা উল্লাহ বলেন, একটি শিশুর প্রকৃত সফলতা কেবল একাডেমিক ফলাফলে নয়; বরং তার চরিত্র, আদব, তাকওয়া ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার মধ্যেই নিহিত। তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণময় ভবিষ্যৎ কামনা করেন।
শাইখ রফিকুল্লাহ মাদানী বলেন, পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বিদ্যালয়ের এই অনন্য শিক্ষাধারার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং শিক্ষার্থীদের নেককার, জ্ঞানী ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার দোয়া করেন।
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর জাতীয় সংগীত, স্কুল অ্যান্থেম, বর্ণাঢ্য গ্র্যাজুয়েশন প্রসেশন, শিক্ষার্থীদের শপথ গ্রহণ, ইংরেজি ও বাংলা পরিবেশনা, নাশিদ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সনদ ও ক্রেস্ট প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্য, কুরআন শিক্ষা, পাঠাভ্যাস, শতভাগ উপস্থিতি, উত্তম চরিত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অর্জনের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল মিরপুর-এর অধ্যক্ষ ফাতিমা জেমাইমা রহমান, ভাইস প্রিন্সিপাল তাসলিমা সামাদ এবং এলিমেন্টারি সেকশনের প্রধান জ্যোতি ফারহানা গাজী। তাঁরা শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রথম একাডেমিক অর্জনে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, কিন্ডারগার্টেন গ্র্যাজুয়েশন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সনদ প্রদান নয়; বরং এটি শিশুদের আত্মবিশ্বাস, কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও আজীবন শিক্ষার যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। বক্তারা অভিভাবকদের আন্তরিক সহযোগিতা ও আস্থার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা, নেতৃত্বগুণ ও ইসলামী মূল্যবোধে সমৃদ্ধ আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের অব্যাহত অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানটি দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপনা করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাতিহা রহমান সুবাহ (গ্রেড–১০), নাফসা তানসিয়াত সুবাইতা (গ্রেড–১০), সাবরিনাত আলম পেয়াশা (গ্রেড–১০) এবং সামারা ইসলাম (গ্রেড–৭)।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল মিরপুর-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অ্যান্ড হেড অব স্কুল মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ বলেন, “আজকের এই গ্র্যাজুয়েশন কেবল একটি সনদ অর্জনের অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি শিশুর জ্ঞান, চরিত্র, ঈমান ও আত্মবিশ্বাস গঠনের যাত্রার প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষা শুধু একটি সফল পেশাজীবন গড়ার জন্য নয়; বরং একজন সৎ, মানবিক, দায়িত্বশীল এবং আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য।”
তিনি আরও বলেন, “এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল মিরপুরে আমরা আন্তর্জাতিক মানের ব্রিটিশ কারিকুলামের সঙ্গে ইসলামী শিক্ষা, আরবি ভাষা, হিফজুল কুরআন, চারিত্রিক গঠন এবং ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষতার সমন্বয়ে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, যা শিক্ষার্থীদের দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় ক্ষেত্রেই সফলতার জন্য প্রস্তুত করে।”
তিনি পবিত্র কুরআনের প্রথম ওহি ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযি খালাক’—”পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন”—(সূরা আল-আলাক: ১) উদ্ধৃত করে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী—”তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যার চরিত্র সর্বোত্তম” (সহিহ বুখারি)—উদ্ধৃত করে তিনি শিশুদের নৈতিকতা, সততা ও উত্তম চরিত্র গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, একটি শিশুর সফলতার পেছনে পরিবার ও বিদ্যালয়ের যৌথ অংশীদারিত্বই সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি এভেরোজ মিরপুর পরিবারের প্রতি আস্থা রাখার জন্য সকল অভিভাবককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও নিরলস পরিশ্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সুস্বাস্থ্য, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নেক জীবন কামনা করে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। পরে গ্র্যাজুয়েটদের সঙ্গে অতিথি, অভিভাবক ও শিক্ষকবৃন্দ স্মৃতিচারণমূলক ফটোসেশনে অংশ নেন।
উল্লেখ্য, এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল মিরপুর আন্তর্জাতিক মানের ব্রিটিশ কারিকুলাম (পিয়ারসন ও ক্যামব্রিজ)-এর পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষা, আরবি ভাষা, হিফজুল কুরআন, চরিত্র গঠন ও ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতা উন্নয়ন-ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিদ্যালয়ের মূল দর্শন হলো—জ্ঞান, নৈতিকতা, ঈমান ও নেতৃত্বের সমন্বয়ে এমন প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা সমাজ, দেশ ও মানবতার কল্যাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
