৪ঠা জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস। আজ থেকে ২৫০ বছর আগে এইদিনে বৃটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দেশটি। ২৫০ বছর পূর্তির এই ঐতিহাসিক ক্ষণে দেশটিতে কোনো উল্লাস নেই, বরং নাগরিকদের মস্তিষ্কে ভর করেছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্লান্তি ও ক্ষোভ। ঠিক ৫০ বছর আগে ১৯৭৬ সালে যখন দেশটির ২০০ বছর পূর্তি উদ্যাপিত হয়েছিল, তখন রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট প্রতিবেশীরা সমস্ত রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে এক হয়ে বিশাল এক ব্লক পার্টিতে মেতে উঠেছিল। উৎসবের সেই অনাবিল আনন্দ স্থায়ী হয়েছিল ভোররাত অবধি। কিন্তু আজ, ২০২৬ সালে এসে দেশটির আড়াইশ’ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণটি পরাশক্তিটির জন্য একাধারে বিপুল সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তি প্রদর্শন এবং গভীর অভ্যন্তরীণ শঙ্কার এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক মেরূকরণ আর সামাজিক অবক্ষয় অনেক মার্কিন নাগরিককে এতটাই হতাশ করেছে যে, তারা আর কোনো উৎসবে শামিল হতে চান না।
নাগরিক অসন্তোষ ও মার্কিন স্বপ্নের অবক্ষয়: যুক্তরাষ্ট্রে পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক দীর্ঘমেয়াদি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। প্রায় ৭০ ভাগ মার্কিন নাগরিক দেশের বর্তমান সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং দেশ যে অভিমুখে যাচ্ছে, তা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয়, প্রায় ৬০ ভাগ মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস যে, এই দেশের সেরা এবং সোনালী দিনগুলো আসলে বহু আগেই অতীতে হারিয়ে গেছে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না। গ্যালাপ-এর জরিপ অনুযায়ী, মাত্র অর্ধেক নাগরিক এখন নিজেদের মার্কিন হিসেবে ‘অত্যন্ত গর্বিত’ বা ‘বেশ গর্বিত’ বলে দাবি করেন, যা গত ২৫ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন রেকর্ড। অন্য একটি স্বাধীন জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, প্রতি চারজন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে তিনজনেরই স্পষ্ট মত দেশটি আজ যে বিশৃঙ্খল রূপ ধারণ করেছে, তা যদি এর প্রতিষ্ঠাতা বা জনকেরা বা ফাউন্ডারিং ফাদার্স বেঁচে উঠে দেখতেন, তবে তারা চরম হতাশ ও লজ্জিত হতেন। এই সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক হতাশার পেছনে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক ক্ষত। ‘দ্য স্টেট অব দ্য নেশন’ প্রজেক্টের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্যও বর্তমানে আয় বৈষম্য হ্রাস, দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব দূরীকরণ কিংবা প্রতি ঘণ্টার মজুরি বৃদ্ধির সূচকে ইতিবাচক উন্নতি করতে পারেনি।
তীব্র আবাসন সংকট এবং জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ মানুষ আজ পিষ্ট। যে ‘আমেরিকান ড্রিম’ বা মার্কিন স্বপ্নের বড়াই দেশটিকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য করেছিল, তা আজ আর টিকে নেই। একটি অভিবাসী প্রধান দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই বাঘা বাঘা প্রতিভাদের বা বহিরাগতদের তাদের শক্তির উৎস এবং মার্কিন স্বপ্নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। চীনেরও একটি নিজস্ব স্বপ্ন রয়েছে, কিন্তু সেখানে বিদেশি বা বহিরাগতদের অন্তর্ভুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে, যেকোনো জাতি বা ধর্মের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারেন এবং তাদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যেকোনো উচ্চতায় পৌঁছানোর স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই মার্কিন স্বপ্নটি অনেকটাই মলিন হয়ে পড়েছে। মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন বা ‘মাগা’ আন্দোলনের একটি বড় অংশ এখন অবৈধ অভিবাসনের পাশাপাশি বৈধ অভিবাসনও পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে চায়। যার ফলে এই বছর দেশের নেট মাইগ্রেশন বা অভিবাসনের হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে। যেখানে শ্বেতাঙ্গ মার্কিন নাগরিকদের অনুপাত ক্রমশ ৫০ শতাংশের দিকে নেমে আসছে, সেখানে ডানপন্থিদের একাংশ এখন ‘হেরিটেজ আমেরিকান’ বা বংশানুক্রমিক নাগরিকদের বিশেষ মর্যাদা দেয়ার দাবি তুলছে, যা দেশটির বর্ণবাদবিরোধী দীর্ঘ অগ্রগতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
ডনাল্ড ট্রাম্পের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও উৎসবের রাজনৈতিক বিভাজন: ১৯৭৬ সালের দ্বিশতবার্ষিকী যেখানে ছিল একটি সমন্বিত, স্বতঃস্ফূর্ত ও সর্বজনীন জাতীয় উৎসব, ২০২৬ সালের ৪ঠা জুলাইয়ের এই আয়োজনটি সেখানে অত্যন্ত খণ্ডিত, বিশৃঙ্খল এবং প্রাণহীন। আর এর কেন্দ্রে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে, দেশের এই ঐতিহাসিক মাইলফলকটি উদ্যাপনের জন্য মার্কিন কংগ্রেসের পক্ষ থেকে একটি সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ও নিরপেক্ষ জাতীয় কমিশন গঠন করা হয়েছিল, যার নাম দেয়া হয় ‘আমেরিকা ২৫০’। এই কমিশনের দায়িত্ব ছিল দেশ জুড়ে বিভিন্ন শহর ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একটি সর্বজনীন জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন করা। বিগত আট বছর ধরে এই কমিশন অত্যন্ত নীরবে বেশ কিছু ভালো উদ্যোগও নিয়েছিল। কিন্তু দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায় যখন ডনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করে ওয়াশিংটন ডিসির সমস্ত উৎসবের নিয়ন্ত্রণ নিজের প্রশাসনের হাতে নিয়ে নেন।
ট্রাম্প এবং মূল ‘আমেরিকা ২৫০’ কমিশন যৌথভাবে কাজ করার কথা থাকলেও, পরবর্তীতে ট্রাম্প সম্পূর্ণ এককভাবে ‘ফ্রিডম ২৫০’ নামে নিজস্ব একটি নতুন সংস্থা গড়ে তোলেন এবং মূল দ্বিপক্ষীয় কমিশনের জন্য বরাদ্দ করা ফান্ডের বড় একটি অংশ নিজের এই ব্যক্তিগত প্রজেক্টে ডাইভার্ট বা স্থানান্তরিত করেন। এর ফলে সাধারণ নাগরিকদের সামনে এখন দু’টি সমান্তরাল ও প্রতিদ্বন্দ্বী উৎসবের চিত্র হাজির হয়েছে। লাস ভেগাসের ৬৬ বছর বয়সী নাগরিক ইডি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার কাছে পরিষ্কার মনে হচ্ছে এই পুরো আয়োজনটি এখন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প একটি ধ্বংসাত্মক বা রেকিল-বল রেভ্যুলুশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার মূল লক্ষ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বকে সুরক্ষিত রাখার জন্য গঠিত সমস্ত বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক জোটগুলোকে ভেঙে ফেলা।
‘ফ্রিডম ২৫০’ বনাম ‘আমেরিকা ২৫০’: ট্রাম্পের এই ‘ফ্রিডম ২৫০’ ব্যানারের অধীনে জাতীয় ঐতিহ্যের বদলে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও রাজনৈতিক কিছু ইভেন্ট বা কর্মসূচির আয়োজন সাজানো হয়েছে। যেমন হোয়াইট হাউসের লনে একটি বহুল আলোচিত ‘ইউএফসি’ প্রতিযোগিতার রাত এবং দেশ জুড়ে ‘ফ্রিডম ট্রাক্স’-এর একটি ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সব অন্ধকার অধ্যায়কে ঢেকে রেখে একটি অতি-পরিশোধিত রূপ প্রদর্শন করছে। এই ফ্রিডম ২৫০-এর উদ্যোগেই ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে ১৬ দিনব্যাপী ‘গ্রেট আমেরিকান স্টেট ফেয়ার’ বা মেলা আয়োজন করা হয়। কিন্তু এই মেলাটি যখনই ট্রাম্পের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে চিহ্নিত হয়, তখন এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে মার্টিনা ম্যাকব্রাইডের মতো নামী মার্কিন শিল্পীরা নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেন। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অন্য শিল্পীদের মেধাহীন বলে কটূক্তি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে ‘গ্রেটেস্ট র্যালি’ বা সেরা সমাবেশ হিসেবে ঘোষণা করেন। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এবং বিশাল খরচের আশঙ্কায় অনেক অঙ্গরাজ্যই এই মেলায় তাদের কোনো প্রতিনিধিদল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যার ফলে মেলা প্রাঙ্গণ এখন প্রায় জনশূন্য। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও হাস্যরসের খোরাক জুগিয়েছে ওয়াশিংটন ডিসির লিংকন মেমোরিয়ালের ঐতিহাসিক জলাধারটি বা রিফ্লেক্টিং পুল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ নির্দেশে এই জলাধারের তলদেশকে ‘মার্কিন পতাকার গাঢ় নীল’ রঙে রাঙানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ কাজ ও নকশার কারণে সেই আস্তরণটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পানির ওপর ভাসতে শুরু করেছে এবং পুরো জলাধারের পানি পচে গিয়ে এক নোংরা ও কুৎসিত কালচে-সবুজ রঙ ধারণ করেছে। এই দৃশ্যটি এখন যেন বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও শাসন ব্যবস্থার এক নিখুঁত রূপক বা মেটাফোরে পরিণত হয়েছে। ৪ঠা জুলাই ন্যাশনাল মলে তীব্র তাপদাহের বা হিটওয়েভের মধ্যেই ট্রাম্প বক্তব্য রাখবেন এবং ফিলিপিন্সের বিশ্বরেকর্ড ভাঙার উদ্দেশ্যে ৮ লাখ ৬০ হাজার আতশবাজির এক অভূতপূর্ব প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। মূল দ্বিপক্ষীয় ‘আমেরিকা ২৫০’ কমিশন ওয়াশিংটনের এই রাজনৈতিক কোলাহল থেকে দূরে সরে গিয়ে লস অ্যানজেলেসে তারকাখচিত একটি চ্যারিটি বা কল্যাণমূলক কনসার্ট এবং নিউ ইয়র্ক, বোস্টন ও ফিলাডেলফিয়ার মতো ঐতিহাসিক শহরগুলোতে অফিশিয়াল ব্লক পার্টির আয়োজন করেছে। তবে এই বড় বড় ঐতিহাসিক শহরগুলোর বাইরে, দেশের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এতটাই স্বাভাবিক ও ম্যাড়ম্যাড়ে যে, বোঝার উপায় নেই এটি দেশের ২৫০ বছরের জন্মদিন। প্রগতিশীল অলাভজনক সংস্থা ‘জেন-জেড ফর চেঞ্জ’-এর সোফিয়া ওঙ্গেলে অত্যন্ত বিদ্রƒপের সুরে বলেন, এটি আমাদের কাছে স্রেফ আর দশটা সাধারণ বৃহস্পতিবারের মতোই মনে হচ্ছে।
প্রযুক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান: অনেকে মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই আধিপত্যের অবক্ষয় ঘটছে, তবে এটি একটি ভুল মূল্যায়ন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কোম্পানিগুলো প্রযুক্তি খাতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে ইতিমধ্যে শত শত বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছে। যদি এআই প্রযুক্তি সত্যিই পুরো বিশ্বকে বদলে দেয়, তবে এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হবে, যা দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামরিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্পের নীতিতে ক্ষুব্ধ মিত্র দেশগুলোর সামনেও চীনকে বর্জন করে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে থাকা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না। বর্তমানে ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপি অনুযায়ী চীনের অর্থনীতি বড় হলেও, ২০২৫ সালের বাজার বিনিময় হারে ৩২.৪ ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি, যা চীনের চেয়ে ৫৫% বড়। শতাব্দী ধরে ডলারই বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হিসেবে আধিপত্য ধরে রাখলেও বর্তমানে বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ কিছুটা কমে ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সামরিক ক্ষেত্রে ২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০২৬ সালের চেয়ে শতকরা ৪৪ ভাগের বেশি এবং এটি অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় দ্বিগুণ। তবে গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ২০২৪ সাল থেকে গবেষণা ও উন্নয়নে চীনের ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে এবং ২০২৫ সালে শীর্ষ জার্নালগুলোর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি নিবন্ধ লিখেছেন চীনারা। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই ফেডারেল বিজ্ঞান সংস্থাগুলো থেকে প্রায় ২৫,০০০ বিজ্ঞানী ও কর্মী চাকরি ছেড়েছেন বা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন।
১৯৭৬ বনাম ২০২৬: অতীতের তীব্র অস্থিরতা ও বর্তমান সংকটের তফাৎ: আজকের অনেক প্রবীণ নাগরিকই ২০২৬ সালের এই মলিন উদ্যাপনের সঙ্গে ১৯৭৬ সালের সেই অবিস্মরণীয় দ্বিশতবার্ষিকীর তুলনা করছেন। তবে বা ইতিহাস বলছে, ১৯৭৬ সালের সেই সময়টাও কিন্তু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে মোটেও শান্ত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে দেখা দিয়েছিল উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং তীব্র বেকারত্ব যার সম্মিলিত রূপকে অর্থনীতিতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দাস্ফীতি বলা হয়। কিন্তু এত কিছুর পরেও, ১৯৭৬ সালের সেই উৎসবটি হোয়াইট হাউসে কে বসে আছেন তার ওপর নির্ভর করতো না, তা ছিল সম্পূর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে। সে সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেরাল্ড ফোর্ড যিনি জনগণের কাছে মোটেও জনপ্রিয় ছিলেন না। একজন অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও তখন উৎসবের আলো এক ফোঁটাও কমেনি। আমেজ ছিল রাজনীতি থেকে বহু উপরে, যা আজ ভাবাই যায় না। ফিলাডেলফিয়ার ৭৪ বছর বয়সী প্রবীণ চলচ্চিত্র নির্মাতা টনি হেরিযা ১৯৭৬ সালের সেই ইতিহাসকে একটু ভিন্ন কোণ থেকে দেখেন। তার মতে, সে সময়ও এই জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবের পেছনে কর্পোরেট বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তীব্র লোভ ছিল, যে কারণে অনেকেই উপহাস করে এর নাম দিয়েছিলেন ‘বাই-সেন্টেনিয়াল’ বা কেনাকাটার উৎসব। এই বাণিজ্যিকীকরণ এবং দেশের ঔপনিবেশিক নীতির প্রতিবাদে ১৯৭৬ সালের ৪ঠা জুলাই উত্তর ফিলাডেলফিয়ার রাস্তায় নেমেছিল দশ হাজারেরও বেশি মানুষের এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল। তারা পুয়ের্তো রিকোর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার এবং দেশের ভেতরে তীব্র অর্থনৈতিক সমতার দাবি তুলেছিলেন। তবে হেরিযা স্পষ্ট করে বলেন, আজকের প্রতিবাদের সঙ্গে তখনকার প্রতিবাদের একটা বড় তফাৎ ছিল ১৯৭৬ সালের সেই প্রতিবাদের মূলে দেশের মৌলিক আদর্শ ও নীতিগুলোর প্রতি এক ধরনের গভীর বিশ্বাস ও ভালোবাসা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এই ক্ষণে এসে তিনি সেই ইতিবাচক মানসিকতা বা আশার আলো আর কোথাও দেখতে পাচ্ছেন না।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরম হতাশা ও ২০৭৬ সালের স্বপ্ন
বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছেই এই আড়াইশ’ বছর পূর্তির মাইলফলকটি অত্যন্ত অর্থহীন এবং মেকি বলে মনে হয়। ‘জেন-জেড ফর চেঞ্জ’-এর সোফিয়া ওঙ্গেলে জানান, বিশ্ব জুড়ে এবং দেশের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্রের অমানবিক আচরণের কারণে তিনি অনেক সময় নিজেদের মার্কিন পরিচয় দিতেও বিব্রত বোধ করেন। ব্রুকলিনের জশ লাভরা অবশ্য মনে করেন, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম যেভাবে দেশের ভুলত্রুটিগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করছে, তার মধ্যে কিছুটা আশার আলো আছে, তবে এই আড়াইশ’ বছরের মাইলফলক উদ্যাপন করাটা তার কাছে বাস্তবতাবিবর্জিত একটি বিষয় বলে মনে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই আড়াইশ’ বছরের জন্মদিনটি হয়তো রাজনৈতিক নোংরামি আর নাগরিক উদাসীনতার কারণে একটি চরম ব্যর্থ আয়োজনে পরিণত হতে যাচ্ছে। তবে এই তপ্ত গ্রীষ্মে সাধারণ মানুষের সামনে এক হওয়ার জন্য আরেকটি সুন্দর বিকল্প এসে হাজির হয়েছে তা হলো বর্তমানে চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ। যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকেরা মার্কিন সংস্কৃতিকে আপন করে নিচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষ সমস্ত রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে মাঠের খেলায় মেতে উঠছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই গভীর রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও অস্থিরতাই আসলে এর বেঁচে থাকার লক্ষণ।
এই তীব্র বিতর্ক ও অন্তর্দ্বন্দ্বই দেশটিকে স্থবির হয়ে পড়তে দেয় না, বরং প্রতিটি বড় সংকটের পর দেশটিকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে এবং সৃজনশীল ধ্বংসের মাধ্যমে নবায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর এই মলিন উৎসবের পর, নাগরিকেরা এখন সুদূর ভবিষ্যতের দিকে চোখ রাখছেন। অনেকেই আজ মনে মনে আশা করছেন, ২০৭৬ সালের ৩০০ বছর পূর্তির উৎসবটি যেন ২০২৬ সালের মতো নোংরা রাজনীতির শিকার না হয়, ১৯৭৬ সালের মতোই সর্বজনীন, মুক্ত এবং আনন্দময় এক উৎসবে রূপ নিতে পারে।
