মেক্সিকো সিটিতে মাটি কেঁপে ওঠার ঘটনা খুব নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম এই মেট্রোপলিটন এলাকায় ভূমিকম্প বেশ স্বাভাবিক ঘটনা। তবে মঙ্গলবার রাতে ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকাতে যে ভূকম্পন তৈরি হয়েছিল, তার উৎস পৃথিবীর কেন্দ্র ছিল না। বরং ইকুয়েডরের বিপক্ষে মেক্সিকোর ২-০ ব্যবধানের মহাকাব্যিক জয়ের রাতে জুলিয়ান কিনিওনেস এবং রাউল হিমেনেজের করা গোল দুটিই গ্যালারিতে এনে দেয় সেই কম্পন।
শেষ ৩২-এর এই লড়াইয়ে মেক্সিকোর জয়টি ছিল দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তাদের প্রথম। ঘরের মাঠের কানফাটানো গর্জনের সেই তীব্রতা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। মনে হচ্ছিল, পুরো দেশের সমস্ত আবেগ ও প্রার্থনা যেন আজতেকার ওই চার দেয়ালে এসে জমা হয়েছে। পুরো ম্যাচে ইকুয়েডরের খেলোয়াড়েরা যখনই বল ছুঁয়েছেন, গ্যালারি থেকে ভেসে আসা লক্ষাধিক মানুষের দুয়োধ্বনি আর শিষ তাদের মানসিকভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। মাঠের এগারো জনের সঙ্গে গ্যালারির হাজারো সমর্থকও যেন রক্ষণভাগের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ম্যাচের পর মেক্সিকোর কোচ হাভিয়ের আগুইরেকে জিজ্ঞেস করা হয়, এটিই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ কি না। তিনি অকপটে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি। কারণ সমর্থকদের সঙ্গে আজ আমাদের আত্মিক সংযোগ তৈরি হয়েছিল। আমরা অতীতে অনেক বড় বড় জয় পেয়েছি, তবে এটির মতো কোনোটিই নয়। কারণ আমরা আমাদের ঘরের মাঠে খেলছিলাম, যেখানে সমর্থকেরা নিজেদের উজার করে দিয়েছে।
মানুষ এই লড়াইকে মূল্যায়ন করে।’ আজতেকা স্টেডিয়ামের এই অনবদ্য আবহের পেছনে জড়িয়ে আছে এর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এটিই বিশ্বের একমাত্র স্টেডিয়াম, যা তিনটি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের সাক্ষী। এখানেই ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ডিয়েগো ম্যারাডোনা তার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড ’ গোলটি করেছিলেন। আবার ১৯৭০ বিশ্বকাপে ইতালি ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যকার ‘গেম অফ দ্য সেঞ্চুরি’র মঞ্চও ছিল এটিই। ইতিহাসের পাশাপাশি পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেও এই স্টেডিয়ামকে মেক্সিকোর এক অপরাজেয় দুর্গ বলতে হবে। এই মাঠে খেলা ৮৮টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের মধ্যে মেক্সিকো হেরেছে মাত্র ২টি ম্যাচে! তাদের জয় ৬৯টিতে, আর ড্র ১৭টি। মেক্সিকো সিটিতে খেলা বিশ্বকাপের শেষ ৯টি ম্যাচে
তারা অপরাজিত (৭ জয়, ২ ড্র)। এমনকি শেষ চারটি ম্যাচে তারা কোনো গোলই হজম করেনি। ম্যাচে ইকুয়েডর যে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল, তা বলাই বাহুল্য। এই জয় আগামী ৬ জুলাই শেষ ১৬-র ম্যাচে ইংল্যান্ড বনাম কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মধ্যকার বিজয়ীদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,২০০ মিটার (৭,২০০ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামে খেলতে আসা যেকোনো দলের জন্যই এক শারীরিক ও মানসিক অগ্নিপরীক্ষা। দুর্ভাগ্যবশত, মেক্সিকোর মাটিতে এটিই এই বিশ্বকাপের শেষ নকআউট ম্যাচ। কারণ কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে শুরু করে ফাইনাল পর্যন্ত পরবর্তী সব ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
আজতেকার মতো ফুটবল ইতিহাসের রোমাঞ্চকর সব গল্প ও জাদুকরী আবহাওয়া উপহার দেয়া ভেন্যুকে বাদ দিয়ে নকআউটের বাকি ম্যাচগুলো আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কিছুটা অদ্ভুত বৈকি! তাই মেক্সিকোকে যদি টুর্নামেন্টে আরও সামনে যেতে হয়, তবে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কেবল ঘরের মাঠের সুবিধা নিয়েই এতদূর আসেনি। আপাতত পরবর্তী মহাযুদ্ধের আগে নিজের মতো করে উদযাপনে মাততে চান মেক্সিকান বস হাভিয়ের আগুইরে। ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে বেশ রসিকতা করেই তিনি বলেন, ‘আমার এখন এক গ্লাস বরফসহ হুইস্কি দরকার, একটা লাগাভুলিন (হুইস্কি)। আজ আমার রুমে সেটা আর অবশিষ্ট নেই। তবে এই কথা আবার কাউকে বলে দিয়েন না যেন! ’
