নতুন দুই শিবিরে বিভক্ত হওয়ার পথে মধ্যপ্রাচ্য

নতুন দুই শিবিরে বিভক্ত হওয়ার পথে মধ্যপ্রাচ্য

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বর্তমানে একটি নাজুক সমঝোতা কার্যকর রয়েছে, যা টিকে থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এই সমঝোতায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে কাতার ও পাকিস্তান।
সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যার লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

কাতার দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের প্রতি তুলনামূলক সমঝোতামূলক নীতি অনুসরণ করে আসছে। দেশটি ইরানের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম পার্স (নর্থ ফিল্ড/সাউথ পার্স) গ্যাসক্ষেত্র ভাগাভাগি করে এবং রপ্তানি-আমদানির জন্য প্রায় পুরোপুরি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে কাতারে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। এই দুই বাস্তবতা বর্তমান সংঘাতে কাতারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত করেছে। কূটনৈতিক মধ্যস্থতা কাতারের বৈদেশিক নীতিরও অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতায় আস্থাহীনতা
দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানকে তারা সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখত। তবে আরব বসন্তের পর থেকেই এসব দেশে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মনোযোগ সরিয়ে চীনকে মোকাবিলায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে ঝুঁকছে।

ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সাময়িকভাবে সেই উদ্বেগ কিছুটা কমালেও সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ আবারও তা সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধ চলাকালে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সরঞ্জামই তাদের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়, কারণ ইরান একাধিকবার এসব স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। একই সঙ্গে এমন খবরও প্রকাশিত হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কিছু সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে ইসরাইলে স্থানান্তর করেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশ্লেষকরা প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের প্রত্যাশিত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এরই মধ্যে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির পর পেন্টাগন কুয়েত ও সৌদি আরবে তাদের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে কিছু কার্যক্রম ইসরাইলে স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
আরও শক্তিশালী হতে পারে ইরান
বর্তমান সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি আরও কমতে পারে এবং একই সঙ্গে মার্কিন প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। যদি ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়, দেশটি অবাধে তেল-গ্যাস রপ্তানি করতে পারে, বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত সম্পদ ফিরে পায় এবং পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠন করা হয়, তাহলে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষতি সত্ত্বেও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইরান অঞ্চলটির অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ওমানের সঙ্গে যৌথ ভূমিকা থাকাও তেহরানের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়াবে।

নতুন নিরাপত্তা জোটের সম্ভাবনা
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থার খোঁজ করবে। অনেক দেশ ভবিষ্যৎ সংঘাত এড়াতে ইরানের সঙ্গে নতুন ধরনের সমঝোতা করতে চাইবে, যদিও পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনও গভীর। এক্ষেত্রে চীন একটি স্বাভাবিক বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে। গত কয়েক বছরে বেইজিং একদিকে ইরানের সঙ্গে, অন্যদিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)-এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। চীনের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানিও আসে এই অঞ্চল থেকেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও অস্ত্র বিক্রি বাড়ালেও সরাসরি সামরিক জোটে যোগ দেয়ার সম্ভাবনা কম।

কাতার-ওমান-ইরান ঘনিষ্ঠ হতে পারে
নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দুটি ভিন্ন গোষ্ঠী গড়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রথম গোষ্ঠীতে থাকতে পারে কাতার, ওমান ও ইরান। ইরানের সঙ্গে গ্যাসক্ষেত্র ভাগাভাগি, হরমুজের ওপর নির্ভরশীলতা এবং অতীতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কাতারকে তেহরানের আরও কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। ওমানও একই ধরনের অবস্থান নিতে পারে।

সৌদি-পাকিস্তান-মিশর অক্ষ
অন্যদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিশরকে নিয়ে আরেকটি নিরাপত্তা জোট গড়ে উঠতে পারে। সৌদি-পাকিস্তান সামরিক সম্পর্ক বহু পুরোনো। গত বছর দুই দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সেই সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। যদিও ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছিল, সাম্প্রতিক যুদ্ধ দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাসকে আবারও সামনে এনেছে। যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সম্ভাব্য সামরিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরবে যুদ্ধবিমান ও সেনা মোতায়েন করলেও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক আফগানিস্তান সংকটে সৌদির তেমন কোনো সামরিক সহায়তা দেখা যায়নি।
অর্থনৈতিকভাবে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল মিশরও ভবিষ্যতে এ ধরনের জোটে যোগ দিতে পারে। কুয়েতও সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় এই গোষ্ঠীর সঙ্গে থাকতে পারে।
তুরস্ক ও আরব আমিরাতের অবস্থান
যদিও তুরস্ককে সম্ভাব্য সুন্নি জোটের সদস্য হিসেবে দেখা হয়, ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় অন্য কোনো সামরিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়া তাদের জন্য সহজ নয়। পাশাপাশি সৌদি আরব ও মিশরের সঙ্গে আঙ্কারার আস্থার ঘাটতিও রয়ে গেছে। একই সময়ে কাতারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইরান প্রশ্নে মধ্যপন্থী অবস্থানের কারণে তুরস্ক ভারসাম্য রক্ষার নীতি অব্যাহত রাখতে পারে।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত যুদ্ধের সময় ইরানি হামলার শিকার হলেও ইসরাইলের সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে। তবে তা প্রকাশ্যে নয়, অনেকটাই নীরবে এগোতে পারে।

ইসরাইলের জন্য অস্বস্তিকর বাস্তবতা
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইসরাইলই একমাত্র রাষ্ট্র, যারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে স্বাগত জানায়নি। কারণ যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরাইলের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই অর্জিত হয়নি। বরং এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কেও কিছুটা টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। গাজা সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত অধিকাংশ আরব দেশের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও সীমিত বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতের জন্য ইতিবাচক বার্তা
এই সমঝোতা ভারতের জন্য স্বস্তির খবর হতে পারে। সাম্প্রতিক যুদ্ধ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। তেলের দাম বেড়েছে, গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। হরমুজ বন্ধ থাকায় ভারতের সার আমদানিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা কৃষি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাসরত বহু ভারতীয় প্রবাসী এই সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ভারতীয় নাবিকরাও হামলার মুখে পড়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ভারতের জন্য অর্থনৈতিকভাবে ইতিবাচক হতে পারে। তবে একই সঙ্গে পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতায় নয়াদিল্লিকে বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে এবং দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করেই এগোতে হবে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন