রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের কাজ, পারস্পরিক অধিক্রমণ ও ভারসাম্য

রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের কাজ, পারস্পরিক অধিক্রমণ ও ভারসাম্য

ফন্ট সাইজ:

আধুনিক রাষ্ট্র তিনটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। আর সেই তিনটি স্তম্ভ হলো: আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। আইন বিভাগের কাজ হলো- রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার বা সংশোধন করা। এ কাজটি করে জাতীয় সংসদ ও সংসদ সদস্যরা। নির্বাহী বিভাগের কাজ হলো আইন বিভাগ কর্তৃক প্রণীত আইন দ্বারা দেশ শাসন তথা পরিচালনা করা। আর বিচার বিভাগের কাজ হলো আইন বিভাগ কর্তৃক প্রণীত আইন ও নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক শাসনের পেক্ষাপটে উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সমস্যায় সংক্ষুব্ধ পক্ষগুলোর মধ্যে বিবাদমান বিষয়গুলোর বিচার করা। এ কাজটি করেন বিচার বিভাগে নিয়োজিত বিচারকরা।

তবে তিনটি বিভাগের কাজের মধ্যে জমিজমার আইলের মতো বা সীমান্তের বর্ডারের কাঁটাতারের মতো বা বাড়ির বাউন্ডারি ওয়ালের মতো কঠোরভাবে (strictly) ভাগ করে দেয়া নয় যে রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের কাজের ক্ষেত্রে কোনো অধিক্রমণ (overlapping) হয় না। মাঝে মধ্যে রাষ্ট্রের তিন বিভাগের মধ্যে কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও অধিক্রমণ হয়। যেমন নির্বাহী বিভাগের আওতাধীন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটরা কিছু ক্ষেত্রে (যেমন: ভেজালবিরোধী অভিযান) ত্বড়িৎ বিচার করে সাজা দেন। নির্বাহী বিভাগের অধীন কর্মকর্তাকে (যেমন: প্লানিং কমিটির সদস্য, বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স ইস্যু সংক্রান্ত কমিটি) আধা-বিচারিক (quasi judicial) দায়িত্ব পালন করতে হয়।

অনুরূপভাবে, আইন বিভাগের কাজ আইন প্রণয়ন হলেও জাতীয় সংসদ তাদের বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে কিছুটা হলেও বিচারিক বা আধা-বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন। যেমন: সংসদীয় কমিটি অতীতের জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকারকেও কমিটির সামনে হাজির হওয়ার জন্য ডেকেছেন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য। অতীতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা ছিল জাতীয় সংসদের হাতে। এখনও বিভিন্ন দেশে পার্লামেন্টের হাতে এই ক্ষমতা রয়েছে। সংসদের অধিবেশন চলাকালে স্পিকারও সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন যেগুলো মোটামুটি নির্বাহী ব্যবস্থা বা আধা-বিচারিক (quasi-judicial) ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করা যায়।

বিচার বিভাগের মূল কাজ বিচার করা হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে নির্বাহী বা শাসনের কাজও করে থাকেন। যেমন: রায় বাস্তবায়ন, আদালতে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করণে ও আদালত অবমাননার ব্যাপারে তারা অনেকটা শাসন বা নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগকে পরোয়ানা জারির ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আইন প্রনয়ণ আইন বিভাগের কাজ হলেও বিচার বিভাগের আওতাধীন উচ্চ আদালত আইনের ব্যাখ্যা ও রায়ের মাধ্যমেও তারা আইন প্রণয়ন করেন যাকে common law বা judge made law বলা হয়। তাছাড়া সংবিধানের ১০৭ অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্টকে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। অনুরূপভাবে নির্বাহী বিভাগও বিভিন্ন ধরনের রুলস ও বিধি-বিধান প্রণয়ন করে কিছুটা হলেও আইন তৈরীর কাজ করেন।
কাজের কিছু কিছু ক্ষেত্রে অধিক্রমণ হলেও মোটা দাগে রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের কাজ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভকে বা তাদের কাজকে একেবারে আক্ষরিক অর্থে পুরোপুরি পৃথক করা যাবে না, কেননা তাতে রাষ্ট্রের কাজ ও রাষ্ট্রের চলা স্থবির হয়ে পড়বে। আর এটা মাথায় রেখেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্যের (check and balance) ধারণা উন্মেষ ঘটেছে। ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কুর ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির ওপর ভিত্তি করে এই ভারসাম্য বা ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স’ (Checks and Balances) ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো সরকারের কোনো একটি বিভাগ যেন এককভাবে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বা স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে। একটি স্তম্ভ যেন আরেকটা স্তম্ভের উপর অযাচিত প্রভাব বিস্তার করতে না পারে বা মূল কাজে হস্তক্ষেপ করতে না পারে এজন্য বিভিন্ন ম্যাকানিজমের মাধ্যমে ভারসাম্য বজায় রাখার ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছে।

আইন বিভাগ আইন প্রণয়ন করবে, তবে তা হতে হবে সংবিধানের নির্দেশিত পন্থায়। সংবিধানের কিছু মৌলিক বিষয় (যেমন: গণতন্ত্র যাকে অন্যতম বেসিক স্ট্র্যকচার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে) কোনোভাবেই সংসদ সংশোধন করতে পারবে না। জাতীয় সংসদ সংবিধানের নির্দেশনা মানছে কি না বা তারা তাদের এখতিয়ার বহির্ভূত কাজ করছে কি না তা দেখার দায়িত্ব বিচার বিভাগের আওতাভুক্ত সুপ্রিম কোর্টের। সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ব্যাখ্যাদাতা (Interpreter) ও অভিভাবক (Guardian) হিসেবে কাজ করে। জুডিশিয়াল রিভিউ তথা রিট ক্ষমতা প্রয়োগ করে সুপ্রিম কোর্ট আইন বিভাগের পাস করা আইন বা শাসন বিভাগের নির্বাহী সিদ্ধান্ত সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হলে তা অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করতে পারে।

জাতীয় সংসদ আইন পাস করলেও বিলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর প্রয়োজন হয় তা আইনে পরিণত হতে। রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর না করে তা পুনর্বিবেচনার জন্য ফিরত পাঠাতে পারেন। যেমন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি মুহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আহমদ বিল স্বাক্ষর না করে ফেরত পাঠিয়েছেন পুনর্বিবেচনার জন্য । তবে দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি নিয়োগপ্রাপ্ত হলে এই ম্যাকানিজম আর তেমন কার্যকর থাকে না। আবার রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর না করলেও যথাসময়ে বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনে পরিণত হয়। সুতরাং রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর করা না করা তেমন ইমপেক্ট তৈরী করে না। তবে, হ্যাঁ রাষ্ট্রপতি যদি দৃঢ়চেতা হোন তাহলে ফিরত পাঠানো সরকার ও সংসদের উপর যথেষ্ট নৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।

অপরদিকে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন আইন বিভাগ বিভিন্ন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে, মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীকে (Question Time) প্রশ্ন জিজ্ঞাসার মাধ্যমে এবং সর্বোপরি সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব আনয়নের মাধ্যমে। তবে সংসদে সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বলবৎ থাকায় সর্বশেষ অস্ত্রটি কার্যকর নয়। অপরদিকে, নির্বাহী বিভাগ ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন কি না এবং আইনি এখতিয়ারের বাইরে যাচ্ছেন কিনা এটা দেখেন বিচার বিভাগ। তবে আদালতের কোন রায় নির্বাহী বিভাগের মনঃপূত না হলে তারা সংসদে নতুন বিল এনে পাস করে আদালতকে ওভারটেক করতে পারেন।

বিচার বিভাগ সাধারণত আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ারে ও সংবিধান সম্মত কাজে অযথা হস্তক্ষেপ করেন না। শুধুমাত্র তারা দেখেন এখতিয়ার বহির্ভূত বা সংবিধান পরিপন্থী কোনো কাজ করছেন কিনা। অপরদিকে, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সীমানার অন্তর্ভুক্ত সকল নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টকে সহায়তা করতে বাধ্য। এভাবেই রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য (check and balance) নিশ্চিত করা হয়।

তবে রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য সন্তোষজনকভাবে নিশ্চিত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণ করা না হয়। এটা করা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ স্পষ্ট করে বলেছে “ রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন”। তাছাড়া বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের জন্য সর্বোচ্চ আদালতের রায় আছে। Secretary, Ministry of Finance v Masdar Hossain (1999) 52 DLR (AD) 82 মামলার রায়ে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের জন্য সুপ্রিম কোর্ট ১২ দফা ডাইরেক্টিভ দিয়েছেন। দু:খজনক হলেও সত্য যে সর্বোচ্চ আদালতের রায় ও সংবিধানের স্পষ্ট বিধান থাকার পরও অতীতের কোন সরকার বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সত্যিকার অর্থে পৃথক করেনি।

নির্বাহী বিভাগের জন্য তো পুরো সচিবালয় আছে। এমনকি আইন বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় আছে। সংবিধানের ৭৯(১) অনুচ্ছেদ বলেছে “সংসদের নিজস্ব সচিবালয় থাকিবে”। কিন্তু বিচার বিভাগের জন্য কোন সচিবালয় ছিল না। নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও প্রমোশনের জন্য নির্বাহী বিভাগের উপর নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষী থাকতে হতো। এটা মাজদার হোসেন মামলার রায় ও সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এটা মাথায় রেখেই বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অধ্যাদেশ জারি করেন। অধ্যাদেশের আলোকে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার করাও হয়েছিল। কিন্ত বর্তমান সরকার ঐ অধ্যাদেশকে বিল আকারে সংসদে না আনার কারণে অধ্যাদেশটি আপনাআপনিই বাতিল হয়ে যায়। সরকারও ইতিমধ্যে সচিবালয়টি সুপ্রিম কোর্ট থেকে ঘুরিয়ে আইন মন্ত্রাণালয়ে নিয়ে আসে।
উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তিনটি স্তম্ভ চমৎকারভাবে কাজ (Function) করে, পারস্পরিক অধিক্রমণ হলেও তা হয় নূন্যতম (Minimal)। বিভিন্ন ম্যাকানিজমের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে স্তম্ভগুলোর চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। আমাদের দেশে সেই সংস্কৃতি ও মরাল হাইগ্রাইন্ড গড়ে ওঠেনি। এখানে বিজয়ীরা সব নিয়ে নেয় (winners take all) এর মতো যাদের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা তারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে সংসদে যেমন প্রভাব বিস্তার করেন, ঠিক তেমনি পৃথক সচিবালয় না থাকার কারণে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদায়নে এবং উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অদৃশ্য হস্তক্ষেপ বা নড়াচড়ার মাধ্যমে বিচার বিভাগেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। আর এমনটি হওয়ার কারণে আইনের শাসন আমাদের দেশে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে না।


নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন