ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: জীবিত উদ্ধারের আশা ম্লান হচ্ছে

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: জীবিত উদ্ধারের আশা ম্লান হচ্ছে

ফন্ট সাইজ:

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেনেজুয়েলায় জীবিত উদ্ধারের আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। যাদের স্বজন এখনও নিখোঁজ আছেন, তাদের অশ্রুসজল অপেক্ষার যেন শেষ নেই। ভূমিকম্পে সেখানে নিহতের সংখ্যা ১৫০০ ছাড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেক জীবিত মানুষ আছেন। তাদেরকে উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেইসব মানুষের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে গেছে। ফলে কোথায় জীবিত মানুষ আছেন, তাও বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। যে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা হয়েছে তাতে এসব মানুষকে উদ্ধারের আশা আস্তে আস্তে শেষ হয়ে আসছে। এরপরও রোববার আরও অলৌকিক উদ্ধার অভিযানের খবর সামনে এসেছে। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, সপ্তাহান্তে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত অবস্থায় মোট ৩৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছিল ১১ বছর বয়সী দুই কিশোর। রোববার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভেঙে পড়া দুটি পৃথক ভবন থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। তবে এখনও কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ থাকায় আরও জীবিত মানুষকে উদ্ধার করার আশা সময়ের সঙ্গে দ্রুত ক্ষীণ হয়ে আসছে। ত্রাণ সংস্থাগুলো বলছে, কোনো বড় দুর্যোগের পর প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা জীবিত মানুষ খুঁজে পাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। রোববার পর্যন্ত কমপক্ষে ১৪৫০ জন নিহত হয়েছেন। ডেলসি রদ্রিগেজ এই দুর্যোগকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে উল্লেখ করেছেন।

বুধবার ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানে। এতে প্রায় ৮০০টি ভবন ধসে পড়ে এবং অসংখ্য মানুষ ভবনের ভেতর আটকা পড়েন। স্বজনদের খুঁজে বের করতে অসহায় পরিবারগুলো ধ্বংসস্তূপে হাত দিয়েই খোঁড়াখুঁড়ি করছে। কিছু মানুষ বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। কিন্তু ভারী কংক্রিটের স্ল্যাব সরানোর মতো সক্ষমতা তাদের নেই। তাই তারা উদ্বেগ নিয়ে ভারী যন্ত্রপাতির অপেক্ষা করছেন। যদিও জীবিত উদ্ধারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা পেরিয়ে গেছে, তবুও উদ্ধারকারীরা হাল ছাড়েননি। তাদের বিশ্বাস, বিশেষ করে যদি কেউ খাদ্য ও পানির নাগাল পেয়ে থাকেন, তাহলে এখনও জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোল্লা বলেন, বিশেষজ্ঞদের ধারণা এখনও জীবিত মানুষ পাওয়া সম্ভব, তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

ডেলসি রদ্রিগেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আশাব্যঞ্জক বার্তা প্রকাশ করে যাচ্ছেন। সপ্তাহান্তে পরিচালিত উদ্ধার অভিযানের ভিডিওও তিনি শেয়ার করেছেন। উদ্ধারকারীরা মইসেস নামে ১১ বছর বয়সী এক কিশোরকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বের করে আনার ভিডিও প্রকাশ করেছেন। সূর্যের আলো থেকে চোখ রক্ষার জন্য তার চোখ ঢেকে দেয়া হয়। কলম্বিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট (ইউএনজিআরডি) জানিয়েছে, প্রায় ৩ মিটার গভীর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছিল মইসেস। শনিবার তাকে উদ্ধার করতে ছয় ঘণ্টা ধরে অত্যন্ত নিখুঁত ও ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযানের সময় ওয়াকিটকিতে এক উদ্ধারকর্মীকে বলতে শোনা যায়, মইসেসকে তার বোন ও মায়ের কাছাকাছি পাওয়া গেছে। তবে তারা দু’জনই মারা গেছেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর ডেলসি রদ্রিগেজ এক্সে আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে কারাবালেদা শহরে আরেক ১১ বছর বয়সী কিশোরকে উদ্ধার করার দৃশ্য দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তিনি লিখেছেন, এই মুহূর্তে প্রতিটি প্রাণই ভেনেজুয়েলার জন্য নতুন আশার প্রতীক।

এদিকে কারাবালেদাতেই ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক বাবা ও তার কিশোর ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারাবালেদা অবস্থিত উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারাবালেদায় কর্মরত এক দমকলকর্মী বলেন, এখনও কয়েক ডজন ভবনে তল্লাশি চালানোই সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত লোকবল নেই। আর এখনও অনেক মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে থাকতে পারেন। এমন সম্ভাবনা খুবই বেশি।

লা গুয়াইরার কাতিয়া লা মার এলাকা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি। সেখানে মানুষ খালি হাতে বহুতল আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত উইলবার নামের এক ব্যক্তি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তিনি তার আটজন স্বজনকে হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজনের মরদেহ এখনও নিজ নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার সহযোগিতা করার বদলে উদ্ধারকাজে বাধা সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, সরকার সড়কগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। এতে সাহায্য পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে গেছে।
এদিকে বারবার আফটারশকের কারণে উদ্ধার অভিযানও ব্যাহত হচ্ছে। এসব কম্পন স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ৬৪ বছর বয়সী বাসচালক হেসুস আন্দুয়েসা বলেন, সত্যি বলতে কী, এতে খুব নার্ভাস লাগে। সামান্য কোনো শব্দও ভয় ধরিয়ে দেয়। ভীষণ ভয়ংকর। সরকারের ধীর ও অদক্ষ ত্রাণ তৎপরতা নিয়েও মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। বিশেষ করে কারিবে ও তানাগুয়ারেনার মতো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এখনও এমন অনেক অঞ্চল রয়েছে, যেখানে ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজই শুরু হয়নি। এক ব্যক্তি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা এবং সড়ক বন্ধ রাখার মাধ্যমে সরকার উল্টো উদ্ধার তৎপরতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

হাজার হাজার মানুষ এখন গাড়ির ভেতরে কিংবা বিমানবন্দর ও গলফ কোর্সের মতো খোলা জায়গায় অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা এমন ভবন থেকে দূরে থাকতে চাইছেন, যেগুলো যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে। কারাবালেদার গলফ কোর্সটি এখন জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। একসময় যত্নে পরিচর্যা করা সবুজ মাঠটি এখন অস্থায়ী হাসপাতাল ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সবকিছু হারানো মানুষ সেখানে দান করা পোশাক ও মানবিক সহায়তার বাক্স ঘেঁটে প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করছেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন