মায়ামির পুরোটা গ্যালারি তখন জ্বলজ্বলে হলুদ। স্টেডিয়ামের চারপাশের বিশালাকার স্ক্রিনগুলোয় হঠাৎ একটা নাম ভেসে উঠলো- নেইমার জুনিয়র। ঠিক সেই মুহূর্তে হার্ড রক স্টেডিয়ামের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে যে চিৎকারটা আছড়ে পড়লো, তার তীব্রতা মাপবে কোন যন্ত্রের সাধ্য? বিশ্বকাপে ফিরলেন নেইমার। ম্যাচের তখন ৭৬ মিনিট। গোল করা ব্রাজিলের ৯ নম্বর মাতেউস কুনহাকে তুলেই ১০ নম্বর জার্সির নেইমারকে নামানোর সিদ্ধান্ত নেন আনচেলোত্তি। আর কুনহার দিলখোলা হাসিতে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন নেইমারকে। নেইমার প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখার পর কেঁদেছেন শেষ বাঁশি বাজার সময়। সেই অশ্রু ছিল আনন্দাশ্রু, যা ছুঁয়ে গিয়েছে ব্রাজিলিয়ানদের হৃদয়ে।
গত মে মাসে যখন কোচ আনচেলোত্তি বিশ্বকাপের ২৬ জনের স্কোয়াড ঘোষণা করেছিলেন, তখন ব্রাজিলের ঘরোয়া মিডিয়া তার ওপর প্রায় ঝাঁপিয়েই পড়েছিল। চেলসির হয়ে লীগে ১৫ গোল করা জোয়াও পেদ্রোকে বাদ দিয়ে কেন ৩৪ বছর বয়সী, চোটজর্জর একজন ‘সাবেক’ তারকাকে দলে নেয়া হলো- তা নিয়ে সমালোচকদের গলার শিরা ফুলে ওঠে। এমনকি টুর্নামেন্টের প্রথম দুই ম্যাচেও যখন ডান পায়ের চোটে নেইমার স্কোয়াডের বাইরে, তখন সেই সমালোচনার আগুনে ঘি পড়েছিল বৈকি! কিন্তু আনচেলোত্তি তো ‘ডন’।
মিডিয়ার সব ‘যদি-কিন্তু-তবে’র জবাব তিনি তার চিরচেনা ইতালিয়ান প্রবাদ দিয়ে এক ঝটকায় উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার দাদার যদি চাকা থাকতো, তবে সে একটা গাড়ি হতো!’ অর্থাৎ, অতীত বা ভবিষ্যতের কাল্পনিক অনুশোচনায় ফুটবল চলে না। ফুটবল চলে বর্তমানের জাদুতে। আর সেই বর্তমানের প্রহর ফুরালো ম্যাচের ৭৬ মিনিটে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর, দীর্ঘ ৯৮১ দিন! হ্যাঁ, প্রায় ৩ বছরের এক যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষার পর অবশেষে ব্রাজিলের সেই চিরচেনা ১০ নম্বর জার্সিটা গায়ে জড়ালেন তিনি। মাতেউস কুনহাকে তুলে যখন তাকে মাঠে নামানো হলো, তখন দলের বর্তমান চালিকাশক্তি ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের চোখজোড়াও হয়তো চকচক করে উঠেছিল। ম্যাচ শেষে ভিনির কণ্ঠে শোনা গেল তেমন কিছুই। বললেন, ‘ও আমাদের আইডল, যে এখানে থাকার জন্য সবসময় লড়াই করেছে ও সবকিছু করেছে। আমাদের আইডলের এই প্রত্যাবর্তন আমাদের সবার জন্যই এক দারুণ মুহূর্ত।’ স্কটল্যান্ডকে তখন ভিনির জোড়া গোল আর কুনহার এক স্ট্রাইকে ৩-০ ব্যবধানে চেপে রেখেছে সেলেসাওরা। ম্যাচ আসলে তখনই শেষ। তবে ২০ মিনিটের কিছু বেশি সময়ের জন্য যখন নেইমার জুনিয়র মাঠে এলেন, ম্যাচের সমস্ত আলো, ক্যামেরা আর গল্পটা এক ঝটকায় ঘুরে গেল তার দিকে। মাত্র ২০ মিনিটে ২৪ বার বল ছুঁলেন তিনি, যেখানে ৭৬ মিনিট খেলা কুনহা ছুঁয়েছিলেন মাত্র ১৪ বার বেশি। মাঠে নেমেই কয়েকটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করলেন, কর্নার শটগুলো নিলেন অবলীলায়। কে বলবে যে লোকটা গত ৩ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের স্বাদ পাননি!
গ্যালারিতে তখন বসে আছেন এক ঝাঁক নক্ষত্র- রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো, কাফু এবং রবার্তো কার্লোস। নেইমার যখন পেলে, কাফু ও দালমা সান্তোসদের সেই রাজকীয় ক্লাবে চার নম্বর ব্রাজিলিয়ান হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে খেলার ইতিহাস লিখছেন, তখন গ্যালারির কিংবদন্তিরাও হয়তো স্মৃতিকাতর হচ্ছিলেন। কারণ তারাও জানেন, নেইমারের এই ৩৪ বছর বয়সে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকাটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।
২০১৪ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার হুয়ান জুনিগার সেই ভয়াবহ লাথি, যা নেইমারকে প্রায় পঙ্গুই করে দিচ্ছিল। সেখান থেকে শুরু করে এসিএল ও মেনিসকাস টিয়ারসহ মোট ছয়টি ক্যারিয়ার-বিধ্বংসী চোট সহ্য করে আজ এতদূর টিকে আছেন তিনি। সাধারণ কোনো ফুটবলার হলে এত চোটের ধাক্কা সামলে হয়তো বুট জোড়া অনেক আগেই তুলে রাখতেন। কিন্তু নেইমার প্রতিবার ফিরে এসেছেন বুক চিতিয়ে। ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি তো মুগ্ধ হয়েই বলছিলেন, ‘নেইমারের মাঠে নামার মুহূর্তেই ম্যাচটা বদলে গেল। বিশ্বসেরা খেলোয়াড়রা এমনই। ম্যাচে নিজের প্রভাব রাখতে তাদের পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থাকার প্রয়োজন হয় না।’
আনচেলোত্তি সংবাদ সম্মেলনে এসে আবারো মনে করিয়ে দিলেন, নেইমারকে কেন দলে রাখাটা ‘প্রয়োজনীয় ঝুঁকি’ ছিল। সেলেসাও বস বললেন, ‘নেইমারের কোনো বাড়তি মোটিভেশনের দরকার নেই। এখানে সবাই তাকে ভালোবাসে। ওর বয়স এখন ৩৪, তবে ব্রাজিলের জার্সি গায়ে দেয়ার জন্য একটা বাচ্চার মনে যে আবেগ আর ভালোবাসা থাকে, ওর ভেতরে এখনো ঠিক সেটাই কাজ করে।’
মাঠের কোলাহল ছাপিয়ে মায়ামির লেন্সে তখন এক টুকরো মহাকাব্য। ৯৮১ দিনের ক্ষত আর কান্নার ওপারে দাঁড়িয়ে মেয়ে মাভিকে কোলে তুলে নিলেন নেইমার, যার বুকে লেখা- ‘১০০% যিশুর’। দীর্ঘ নরকবাস পেরিয়ে তখন চিবুক বেয়ে নেমে আসছে এক রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের আনন্দাশ্রু। হেক্সার তীব্র ক্ষুধায় চোটকে বশীভূত করে জাদুকর জানিয়ে দিলেন, গল্পটা এখনো শেষ হয়নি!
