প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশিদের জন্য ফের চালু হচ্ছে ভারতীয় পর্যটন ভিসা। গতকাল ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এ ঘোষণা দিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে, আগামী ২৮শে জুন থেকেই বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা দেয়ার কার্যক্রম শুরু করবে ভারতীয় ভিসা সেন্টারগুলো। এর মধ্যদিয়ে ২২ মাস ধরে চলা ভারতীয় ভিসায় যে জট ছিল তা খুলতে যাচ্ছে।
এদিকে হাইকমিশনার হিসেবে ঢাকায় আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক মিশন শুরু করেছেন ত্রিবেদী। গতকাল দুপুর ১২টায় বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে নিজের পরিচয়পত্র হস্তান্তরের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছেন তিনি। তার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর পর পরই রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা সেন্টার পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশিদের জন্য ফের পর্যটন ভিসা চালুর তারিখ ঘোষণা করেন হাইকমিশনার। দীনেশ ত্রিবেদী বিদায়ী হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।
পুনরায় ভিসা কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে ত্রিবেদী জানান- ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনার ভিসা সেন্টার থেকে একযোগে ভিসার কার্যক্রম শুরু হবে। বলেন, তিনি যখন বেনাপোল হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছিলেন তখনই ভিসার প্রশ্নটি উঠেছিল। তার মতে, ভিসা খুব জরুরি বিষয়। তাই এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গত এপ্রিলে ভারত সরকার দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। ১২ই জুন দীনেশ ত্রিবেদী সড়কপথে বাংলাদেশে আসেন। বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন।
চব্বিশ-এর গণ-অভ্যুত্থানে পতিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তী আমলের পুরো সময় পর্যটন ভিসা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করার চার মাস পর পর্যটন ভিসা চালু করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ওদিকে দীনেশ ত্রিবেদীকে দিল্লির কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রী সমতুল্য মর্যাদা দিয়েছে ভারত সরকার। দিল্লিতে ত্রিবেদীকে কেবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা দেয়া ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন রাজনীতিককে হাইকমিশনার করে পাঠানো নজিরবিহীন না হলেও এমন ঘটনা বিরল। ঢাকার সঙ্গে ‘পিপল টু পিপল’ ও ‘হারানো রাজনৈতিক সম্পর্ক’ পুনরুদ্ধারে দিল্লি ত্রিবেদীকে হাইকমিশনার করে পাঠিয়েছে বলে মনে করা হয়।
দীনেশ ত্রিবেদীকে কেবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে ভারত সরকার
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা থেকে জানান, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে কেবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক কার্যাবলীর জন্য তাকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রীর সমতুল্য মর্যাদা দেয়া হয়েছে।
বুধবার ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি কমলেশ রবিদাস স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই কথা জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, অগ্রাধিকার সারণী (টেবিল অফ প্রেসিডেন্স) সংশোধন না করে ব্যক্তিগত পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে অগ্রাধিকার সারণীতে (টিওপি) কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রীর সমতুল্য মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। অগ্রাধিকার সারণীতে এই অবস্থানটি শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক কার্যাবলীর জন্য বলে জানানো হয়েছে।
কিছুদিন আগে জনতার চোখে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পর্যবেক্ষক মহলের একাংশের মতে, ত্রিবেদী যেহেতু একজন রাজনীতিক, কূটনীতিক নন, তাই খুব সম্ভবত তাকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদা দেয়া হতে পারে, যাতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে পারেন। অতীতে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত সংবিধান বিশেষজ্ঞ এল. এম. সিংভির ক্ষেত্রে তা হয়েছে।
গত ২৭শে এপ্রিল ত্রিবেদী বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিশ্চিত হন। বাংলাদেশের সঙ্গে গত দেড় বছরের বেশি সময়ের তিক্ততা দূরে সরিয়ে যখন সম্পর্ক পুনঃনির্মানের চেষ্টা চলছে ঠিক তখনই ভারত সরকার পেশাদার কূটনীতিবিদকে দায়িত্ব না দিয়ে একজন রাজনীতিবিদকে দায়িত্ব দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে ভারতের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে ঢাকায় এর আগে কখনো কোনো রাজনীতিবিদকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয় নি। একজন সাবেক কূটনীতিক উল্লেখ করেছেন যে, ত্রিবেদীর নিয়োগের তাৎপর্য এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় যে, বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনিই প্রথম অ-পেশাদার কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব যাকে বাংলাদেশে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
৭৫ বছর বয়সী ত্রিবেদী মনমোহন সিং-এর নেতৃত্বাধীন সরকারে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তিনি রাজ্যসভা ও লোকসভা উভয় কক্ষেই পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণার শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ব্যারাকপুর আসন থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। রেলভাড়া বৃদ্ধির প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর ২০২১ সালে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন। ত্রিবেদী গুজরাটি পরিবারের সন্তান হলেও কলকাতাতেই তার স্কুল ও কলেজ জীবন অতিবাহিত হয়েছে।
