বিশ্বকাপে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা

বিশ্বকাপে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বের ছয়টি মহাদেশে বাংলাদেশের মানুষ রয়েছে প্রায় আড়াই কোটি। এদের কেউ স্থায়ীভাবে এবং অনেকে কর্মের জন্য বাস করেন। এরা সবাই দেশপ্রেমিক, সবাই বাংলাদেশকে ভালোবাসেন। বাংলাদেশ মানেই তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি গর্বের দেশ। প্রবাসে থাকলেও তারা প্রতি পলে পলে অনুভব করেন বাংলাদেশকে। তাদের রয়েছে দেশপ্রেম ও ভালোবাসা। যেখানেই সুযোগ পান সেখানেই তুলে ধরেন আমাদের গর্বের লাল সবুজ পতাকাটি।

উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ আমেরিকা-মেক্সিকো এবং কানাডায় চলছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আয়োজন। বিভিন্ন স্টেডিয়ামে চলছে এই গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। খেলছে বিশ্বের আটচল্লিশটি দেশ। এইসব দেশে বসবাসরত প্রবাসীদের অধিকাংশই বড় দু’টি দলের সমর্থক। কেউ আর্জেন্টিনা কেউবা ব্রাজিলের। আরও আছে জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন সহ আরও অনেক দেশের সমর্থক। এরমধ্যে ছন্দময় ফুটবলের জন্য আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলকে ঘিরেই বাংলাদেশি দর্শকদের উচ্ছ্বাস-আনন্দ আগ্রহ বেশি।

নিউ ইয়র্কের টাইমস্কোয়ারে আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচের আগেরদিন জড়ো হয়েছিল আর্জেন্টিনা থেকে আসা সেদেশের ফুটবলভক্তরা। দিয়াগো ম্যারাডোনা-মেসির দেশের মানুষদের সঙ্গে টাইমস্কোয়ারে মিলিমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তরা। আর্জেন্টিনাকে সমর্থনের পাশাপাশি তারা টাইমস্কোয়ারে উড়িয়েছে বাংলাদেশের পতাকাও। সেখানে আর্জেন্টাইনদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের উচ্ছ্বাসে লাল সবুজের পতাকা উড়তে দেখে অনেক বাঙালি আবেগ আপ্লুত হয়ে গেছেন।

এখানেই শেষ নয় বিশ্বকাপের কানাডা পর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নোরা ফাতেহীর সঙ্গে পারফর্ম করেছে বাংলাদেশের ছেলে সঞ্জয়। সে তার হাতে বাংলাদেশের পতাকা এবং টাইগারের ছবি সংবলিত লোগো যেভাবে দেখিয়েছে সেটা সারা বিশ্ব দেখেছে। আমরা পুলকিত হয়েছি। গর্বে আমাদের বুক ভরে উঠেছে। এই প্রবাসীদের কারণেই ম্যারাডোনা, মেসি, নেইমাররা বাংলাদেশকে চেনে। আমাদের দর্শকদের একটা বড় অংশই যেহেতু প্রবাসী তাদের এই ভালোবাসার মূল্য কি আমরা দিতে পারি? বাংলাদেশে যে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার অজস্র ভক্ত রয়েছে সেটা তারা জানান দেন। তাদের কল্যাণেই মেসি-নেইমার জানতে পারেন বাংলাদেশে তাদের এত ভক্ত রয়েছে।

বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে আমেরিকা-কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বসবাসরত বাংলাদেশিরা তাদের সমর্থিত দলের পতাকার পাশাপাশি আমাদের লাল সবুজ পতাকাটিও তুলে ধরে উল্লাস প্রকাশ করেন। শুধু দেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও ফুটবলের এই বৈশ্বিক মিলনমেলায় সমানভাবে মেতে ওঠে। কানাডা, আমেরিকা, ফ্রান্স, ইতালি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীরা নিজ দেশের সংস্কৃতি ও ফুটবলের আবেগ একসঙ্গে উদ্‌যাপন করেন। আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বুকে বাংলাদেশকে ধারণ করে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে। এটাই তো দেশপ্রেম। ইতালির রোম-মিলান, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা উড়ছে। সমর্থিত দেশের পতাকার পাশাপাশি এই যে আমাদের দেশের গর্বিত লাল-সবুজ পতাকা উড়ছে- এটাই তো আমাদের গর্ব।

আমাদের দেশের এবং প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশি সবাই স্বপ্ন দেখে একদিন বাংলাদেশে জন্ম নেবে ম্যারাডোনা-রোনালদো, মেসির মতো তারকা খেলোয়াড়। তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশ একদিন খেলবে বিশ্বকাপ ফুটবল। সেই ফুটবল আসরে অগণিত বাংলাদেশির সঙ্গে নিজ দেশের পতাকা সহ বাংলাদেশের পতাকাও থাকবে তাদের হাতে। গর্বের বাংলাদেশকে নিয়ে তারাও উচ্ছ্বাস আর আনন্দে মেতে উঠবে। ব্রাজিল আর্জেন্টাইন দর্শকদের সঙ্গে এখন যেমন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বাংলাদেশিরা বা বাংলাদেশের পতাকা। সেইদিনও সেই দৃশ্য আমরা দেখবো। এই স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে আমাদের পরিকল্পিত ফুটবল খেলতে হবে। তারকা ফুটবলার তৈরি করতে হবে। যাদের পায়ের জাদুতে থাকবে শুধুই ছন্দময় ফুটবল। একদিন ফুটবলই হবে আমাদের প্রাণ। ক্রিকেট যেমন আমাদের অস্তিত্বে মিশে গেছে তেমনি ফুটবলও একদিন আমাদের প্রাণের খেলা হবে।

এবারের বিশ্বকাপ খেলাগুলো হচ্ছে বাংলাদেশে গভীর রাত থেকে। রাত জেগে তরুণ যুবারা খেলা দেখছেন, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। সমর্থন জানাচ্ছেন তাদের প্রিয় দলকে। যেন আমরাই খেলছি। এটা ভাবতেই ভালো লাগে যে, আমাদের তরুণরা খেলায় মগ্ন থেকে সব রকম হানাহানি থেকে মুক্ত আছে। এভাবেই যেন আগামীর বাংলাদেশ গড়ে ওঠে সেটাই প্রত্যাশা আমাদের। খেলা আমাদের এতটাই মোহগ্রস্ত করে যে দেশের আনাচে কানাচে সবখানে প্রিয় দলের জার্সি পরে ছেলে-যুবা-বৃদ্ধ সকলেই আনন্দ করছে। আমি বাসা থেকে বের হয়ে চ্যানেল আইতে আসার সময় এসব দৃশ্য বেশ উপভোগ করি। কারও গায়ে হলুদ জার্সি। কারও গায়ে আকাশি রঙের জার্সি।

এ ছাড়াও জার্মানি-ইংল্যান্ড এমনকি ইরানের জার্সিও পরে আছে অনেকে। এই বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের জার্সির একটা বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে যেটা আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। আমরা দেখেছি অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের নাম কেউ না জানলেও খেলোয়াড়দের নাম ঠিকই জানে তারা। আমরা যেমন ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড় ব্রায়ান লারার নাম জানি কিন্তু সেদেশের প্রেসিডেন্ট বা সরকারপ্রধানের নাম ক’জন জানি? এভাবেই খেলাধুলা একটি দেশকে বিশ্বে পরিচিত করে তোলে। রাজনীতিতে বিভাজন থাকলেও খেলাধুলা সবাইকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়। আমার মনে পড়ছে একবার অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আশরাফুলের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম। স্টেডিয়ামে পত্‌ পত্‌ করে উড়েছিল বাংলাদেশের পতাকা। বেজে উঠেছিল আমার সোনার বাংলা...। বিদেশের মাটিতে যখন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে গর্বে আমাদের বুক উঁচু হয়ে যায়। মন ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলি- আহ্‌ এই আমাদের বাংলাদেশ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন