সাম্বার তালে দুলছেন ভিনি, ব্রাজিলের শুভ লক্ষণ

সাম্বার তালে দুলছেন ভিনি, ব্রাজিলের শুভ লক্ষণ

ফন্ট সাইজ:

গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে বার্তা দিয়ে রাখলো ব্রাজিল। শিরোপার দৌড়ে তারাও ফেভারিট। এ ঘোষণার মুখপাত্র ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ ‘সি’ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে পৌঁছলো ব্রাজিলিয়ানরা। আর সেলেসাওদের এ কৃতিত্বের সারথি এবারের বিশ্বকাপে তিন ম্যাচে চার গোল করা ভিনি। সাম্বার তালে নেচে ব্রাজিলকে নিয়ে যাচ্ছেন স্বপ্নীল গন্তব্যে।

রিও ডি জেনিরো রাজ্যের সাও গঞ্জালোর দরিদ্র শহরে জন্ম ভিনির। যেখানে অপরাধের ছায়া শিশু-কিশোরের পেছনে ধাওয়া করে। সেই শহর থেকে হলুদ জার্সি গায়ে জড়ানোর স্বপ্ন দেখেন তিনি। ছোটবেলায় রাস্তার ধারে খালি পায়ে ফুটবল আনন্দে মেতে থাকার মাঝে আনন্দ খুঁজতেন ভিনি। সেই ছেলেটিই এখন ব্রাজিলের কোটি সমর্থকের আবেগ, কান্না ও হাসির উপলক্ষ। ছয় বছর বয়সে বাবার হাত ধরে ফুটবলের হাতেখড়ি ভিনির। নয় বছর বয়সে ফ্লামেঙ্গোর ফুটসাল দলে সুযোগ পাননি। কিন্তু দমে যাননি। পরের বছরই ফুটবল দলে জায়গা পান। এখানে খেলতে যেতে প্রতিদিন ভিনিকে পাড়ি দিতে হতো ৪৫ মাইল পথ। কখনো ট্রেনে দাঁড়িয়ে আবার কখনো বাসে ঝুলে এ পথ পাড়ি দিতেন। সেই পরিশ্রম আর কষ্টের গল্পই আজ ভিনিকে বানিয়েছে বিশ্বকাপ হিরো। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে সবকটিতে গোল করে ভিনিসিয়ুস ঢুকে পড়েছেন ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের এক সোনালি অধ্যায়ে। এই কীর্তি এর আগে শুধু তিনটি বিশ্বকাপে দেখা গেছে। ১৯৭০ সালে জেয়ারজিনহো, ১৯৯৪ সালে রোমারিও, এবং ২০০২ সালে রোনালদো ও রিভালদো। সেই তিনটি বিশ্বকাপেই ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়। তাই ভিনির এই কীর্তি শুধু রেকর্ড নয়, শুভ লক্ষণও বটে। এবারের বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং ব্রুট হালান্দের সমান চার গোল ভিনির। এক গোল বেশি নিয়ে শীর্ষে মেসি।

গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ভালোভাবেই আছে ভিনি। ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপ মিলে ব্রাজিলের ১৫ গোলের মধ্যে আটটিতে ভিনির সরাসরি অবদান। পাঁচ গোল ও তিন অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ দলের ৫৩ শতাংশ গোল এসেছে ভিনির হাত ধরে। দীর্ঘদিন ধরে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে নিয়ে অভিযোগ রিয়াল মাদ্রিদে তিনি যতটা উজ্জ্বল, জাতীয় দলে ততটা নন। কিন্তু কার্লোস আনচেলোত্তি ব্রাজিলের কোচ হওয়ার পর যেন সব বদলে গেছে। আনচেলোত্তির অধীনে মাত্র ১৩ ম্যাচে ৭ গোল করেছেন ভিনি। রিয়ালে যেভাবে বাঁ দিকের উইঙ্গার হিসেবে খেলতে খেলতে গোটা মাঠে বিচরণের স্বাধীনতা পান, জাতীয় দলেও সেই লাইসেন্সটাই তাকে দিয়েছেন আনচেলোত্তি। গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে ব্রাজিল একটু ছন্দহীনই ছিল। মরক্কোর বিপক্ষে ড্র, হাইতির বিপক্ষে জয় পেলেও স্বভাবসুলভ খেলা চোখে পড়েনি। কিন্তু নেইমারের প্রত্যাবর্তন ম্যাচে এসে যেন পুরো দল বদলে গেল। প্রথমার্ধে ১১টি শট নেয় ব্রাজিল। ২০১৮ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে নকআউটের পর এটাই কোনো হাফটাইমে তাদের সর্বোচ্চ।
মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ম্যাচ শুরুর সপ্তম মিনিটে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেন ভিনি। স্কটল্যান্ডের ডিফেন্ডার স্কট ম্যাকেনা গোলরক্ষকের বাড়ানো বল নিতে দেরি করেন। সেই সুযোগে বলটি কেড়ে নেন ব্রাজিলের রাইয়ান। রিবাউন্ড হয়ে বল গিয়ে পড়ে ভিনির সামনে। মুহূর্তের মধ্যে গোলকিপার অ্যাঙ্গাস গানকে পাশ কাটিয়ে ফাঁকা নেটে বল পাঠান তিনি। এর ১৬ মিনিট পর আরেকটি নাটক।

স্কটিশ ডিফেন্ডার জ্যাক হেন্ড্রির থেকে বল কেড়ে নেন ভিনি। আবারো জালে বল পাঠান। কিন্তু ভিএআর রিভিউতে মেক্সিকান রেফারি সিজার রামোস ফাউলের সিদ্ধান্ত দিয়ে গোলটি বাতিল করে দেন। কিন্তু ভিনিকে দমানো গেল না। বিরতির ঠিক আগে, প্রথমার্ধের যোগ করা তৃতীয় মিনিটে, ব্রুনো গিমারাইসের ক্রস থেকে পিছনের পোস্টে একা দাঁড়ানো ভিনি মাথা ছুঁইয়ে বল পাঠালেন জালে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে কোচ কার্লোস আনচেলোত্তির সঙ্গে বাজি ধরেছিলেন ভিনি। এই বিশ্বকাপে হেডে গোল করবেন তিনি। আনচেলোত্তি বিশ্বাসই করেননি। বলেছিলেন অসম্ভব। কিন্তু ভিনি করে দেখালেন। ম্যাচ শেষে হাসতে হাসতে বললেন, ‘কোচকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। উনি বলেছেন পুরস্কার দেবেন। আমি অপেক্ষায় আছি।’ দ্বিতীয় গোলের পর চিরচেনা উদ্যাপনে মাতেন ভিনি। কর্নার ফ্ল্যাগের সামনে গিয়ে সাম্বার তালে নাচেন। আর গ্যালারি থেকে হলুদ জার্সি পরা ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা স্লোগান দেন, ‘বাইলা ভিনি’। নাচো ভিনি, নাচো! দ্বিতীয়ার্ধে ভিনির হ্যাটট্রিক প্রায় হয়েই গিয়েছিল। ৫১ মিনিটে দুর্দান্ত প্রচেষ্টা রুখে দিলেন গোলকিপার গান। ৬০ মিনিটে মাথেউস কুনহা তৃতীয় গোল করেন গিমারাইসের অ্যাসিস্টে। এরপর ৭৬ মিনিটে মাঠে নামেন নেইমার।

৯৮১ দিন পর হলুদ জার্সিতে ফিরলেন ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতা। শেষ দিকে নেইমার ভিনিকে গোলের সুযোগও তৈরি করে দিলেন। কিন্তু গানের দেয়াল ভাঙা গেল না। ৩-০ গোলে ম্যাচ জিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, রাউন্ড অফ ৩২ নিশ্চিত। ১৯৭০-এ জেয়ারজিনহো, ১৯৯৪-এ রোমারিও, ২০০২-এ রোনালদো। প্রতিটি বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলে একজন করে ‘পালের গোদা’ ছিলেন। সাম্বার তালে দুলে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র সেই পথেই পা বাড়াচ্ছেন ধীরে ধীরে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন