টোকিওর বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী তরুণী মাই (ছদ্মনাম) আগে একটি হাসপাতালে কাজ করতেন। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির সময় হাসপাতালের উপচে পড়া কাজের চাপ ও মানসিক ধকল তিনি আর নিতে পারছিলেন না। একজন সঙ্গীহীন মা (সিঙ্গেল মাদার) হিসেবে পরিবারের খরচ জোগাতে টাকারও ভীষণ প্রয়োজন ছিল তার। হাসপাতালের চেয়ে অনেক বেশি আয়ের প্রলোভনে তিনি যৌন পেশায় যুক্ত হন।
প্রথমে নীল ছবির অভিনেত্রী এবং পরবর্তীতে ‘ডেলিভারি হেলথ’ (গ্রাহকের বাড়ি বা হোটেলে গিয়ে যৌন সেবা দেয়া) কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। দুই ঘণ্টার একটি সেশনের জন্য তিনি ৩০ হাজার ইয়েন (প্রায় ১৯০ ডলার) আয় করেন। জাপানের বিশাল ও বিস্তৃত যৌন শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো নারী। দেশটিতে এই ব্যবসা বছরে প্রায় ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ইয়েন (১২০০ থেকে ৩১০০ কোটি ডলার) মূল্যের বলে ধারণা করা হয়। এটি জাপানিদের সামাজিক জীবনের সঙ্গে একরকম জড়িয়ে গেছে। ২০২২ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, জাপানের প্রায় শতকরা ৪৮ ভাগ পুরুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অর্থের বিনিময়ে যৌন সেবা নিয়েছেন। যেখানে বৃটেনে এই হার মাত্র ১১ ভাগ। তবে অতি সম্প্রতি এই খাতের প্রতি জাপানি আইন প্রণেতাদের দীর্ঘদিনের সহনশীলতায় বড় ধরনের চির ধরেছে।
দু’টি সাম্প্রতিক ঘটনা জাপানের জটিল ও বিভ্রান্তিকর যৌন আইন এবং সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে নতুন করে খতিয়ে দেখতে বাধ্য করেছে। প্রথমটি ছিল একটি ভয়াবহ অপরাধ। গত বছর প্রশাসন টোকিওর একটি যৌনপল্লী থেকে ১২ বছর বয়সী এক থাই শিশুকে উদ্ধার করে। যাকে পাচার করে এনে জোরপূর্বক এই কাজে বাধ্য করা হয়েছিল। দ্বিতীয় কারণটি হলো, টোকিওর রেড-লাইট ডিস্ট্রিক্টের ওকুবো পার্কের আশপাশে প্রকাশ্য রাস্তায় নারী যৌনকর্মীদের উপস্থিতি হঠাৎ অনেক বেড়ে যাওয়া। জাপানে প্রকাশ্য রাস্তায় গ্রাহকের জন্য অপেক্ষা করা বা গ্রাহক ডাকা সম্পূর্ণ অবৈধ। ফলে খোলামেলাভাবে রাস্তায় নারীদের দাঁড়িয়ে থাকার এই দৃশ্য সাধারণ মানুষকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে।
ক্ষোভের কারণ সস্তা ইয়েন ও ‘আহত’ জাতীয় অহঙ্কার: এই বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে বিদেশি পর্যটকদের আগমন। জাপানি মুদ্রা ইয়েনের মান কমে যাওয়ায় বিদেশিদের কাছে এখন জাপান ভ্রমণ এবং সেখানকার যৌনসেবা বেশ সস্তা হয়ে গেছে। ওকুবো পার্কে বিদেশি পর্যটকরা যেভাবে জাপানি নারীদের সঙ্গে দরদাম করছে, তার অসংখ্য ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ডানপন্থি পপুলিস্ট দল ‘সানসেইতো’ নেতা কামিয়া সোহেই একটি ভিডিওতে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। তবে এই ক্ষোভের পেছনে আসলে লুকিয়ে আছে একধরনের আহত জাতীয় অহঙ্কার। ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে যখন জাপানের অর্থনৈতিক উত্থান চলছিল, তখন জাপানি পুরুষেরা মূলত যৌন পর্যটক হিসেবে দেদারসে বিদেশে যেতেন। আর আজ ২০২৬ সালে এসে খোদ জাপানের মাটিতেই বিদেশি পর্যটকরা যৌন ক্রেতা হিসেবে দাপট দেখাচ্ছে, যা জাপানিদের জাতীয় সম্মানে আঘাত হেনেছে।
নারীর অধিকার গৌন, প্রশাসনের বৈষম্যমূলক ভূমিকা: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ওকুবো পার্কের চারপাশের রাস্তা থেকে কেবল নারী যৌনকর্মীদেরই আটক বা গ্রেপ্তার করছে। নারী অধিকার রক্ষাকারী সংগঠনগুলো প্রশাসনের এই একপেশে নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। ‘প্যাপস’ নামের একটি নারী অধিকার গোষ্ঠীর কর্মকর্তা কানাজিরি কাজুনা বলেন, পুলিশ নারীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ খদ্দেররা মুচকি হাসছে। সংসদে এই বৈষম্যের বিষয়টি উত্থাপিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে বিচার মন্ত্রণালয়কে প্রচলিত আইন ও নীতি সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন। এই সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে জাপানে এখন বড় ধরনের বিতর্ক শুরু হয়েছে।
নর্ডিক মডেল: জাপানের কিছু নারীবাদী সংগঠন সুইডেন ও ফ্রান্সের মতো ‘নর্ডিক মডেল’ চালুর দাবি জানাচ্ছেন। এই মডেলে যৌনসেবা কেনা বা পুরুষ খদ্দেরকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয়, কিন্তু যৌন বিক্রেতা বা নারীদের শাস্তি থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেয়া হয়। জার্মান/ডাচ্ মডেল: অন্য পক্ষের দাবি, ক্রেতাদের ওপর কড়াকড়ি করলে এই ব্যবসা সম্পূর্ণ আন্ডারগ্রাউন্ড বা গোপনে চলে যাবে, যা নারীদের আরও বেশি সহিংসতার ঝুঁকিতে ফেলবে। তারা জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মতো এই শিল্পকে সম্পূর্ণ বৈধ ও নিয়মতান্ত্রিক করার পক্ষে। ‘সিয়েন্তে’ নামক যৌনকর্মী অধিকার গোষ্ঠীর নাকায়ামা মিসাতো বলেন, যৌন কাজ কোনো অপরাধ নয়, এটিও জীবিকা নির্বাহের একটি বৈধ উপায়।
গলদ যেখানে: প্রকাশ্যে যৌনতায় বিধি নিষেধ ও আটকের ঘটনা থাকলেও নানান মোড়কে চলতে থাকে টাকার বিনিময়ে যৌনসেবা। জাপানে রয়েছে ঘরের ভেতরের বিশাল যৌন শিল্প। এরই একটি ‘সোপল্যান্ড’। এখানে গ্রাহকেরা কেবল গোসল করার নামে টাকা দেন, কিন্তু ভেতরে যৌন সম্পর্ক হলেও প্রশাসন চোখ বন্ধ করে রাখে। এমনভাবে অসংখ্য ফাঁকফোকরে ভরা আইন। কার্টিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তাকো ইয়াসুও বলেন, জাপানি প্রশাসনের মূল লক্ষ্য নারীদের সুরক্ষা বা অধিকার নিশ্চিত করা নয়, বরং এই ‘অনাচার’ যেন ভদ্রভাবে জনসাধারণের চোখের আড়ালে থাকে, সেটুকুই তাদের মূল চাওয়া। তাই সামগ্রিক কোনো বড় পরিবর্তন বা যুগান্তকারী সংস্কারের সম্ভাবনা খুব কম। অধ্যাপক তাকো ইয়াসুও বলেন, রাষ্ট্র বা প্রশাসনের জন্য এটিই সবচেয়ে কম খরচে জনসাধারণের সামনে নিজেদের কঠোর অবস্থান দেখানোর সহজ উপায়। তবে এই পুরো বিতর্কের বিষয়ে উষ্মা প্রকাশ করে জাপানের রক্ষণশীল মানসিকতাকে দায়ী করেন আইন প্রণেতা শিওমুরা আয়াকা।
তিনি বলেন, অনেক আইন প্রণেতা, বিশেষ করে রক্ষণশীলরা, নারীদের যৌন স্বাধীনতাবোধ বা অবাধ মেলামেশার ধারণাটি নিয়েই অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে অধিকার বা সুরক্ষার চেয়েও রাস্তায় নারীদের প্রকাশ্য উপস্থিতি এখন জাপানি সমাজের একাংশের কাছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং ঐতিহ্যগত অবক্ষয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন প্রণেতারা নারীদের অধিকারের চেয়ে সমাজে ‘শৃঙ্খলা ফেরানো’ এবং জাতীয় সম্মান রক্ষার্থেই বেশি তৎপর।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
