ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র, কাকে বিশ্বাস করবে বিশ্ব?

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র, কাকে বিশ্বাস করবে বিশ্ব?

ফন্ট সাইজ:

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ১৭ জুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। তবে সমঝোতা স্মারকের প্রকাশিত নথি নিয়ে দেশ দুইটির মধ্যে বিতর্ক এখনও থামেনি। নথিটি ইরানের পক্ষে অতিরিক্ত সুবিধাজনক বলে সমালোচিত হওয়ার পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দাবি করে আসছে যে, চলমান আলোচনায় তেহরান আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটি এমওইউ’তে উল্লেখ নেই, আর ইরানও ধারাবাহিকভাবে সেগুলো অস্বীকার করে যাচ্ছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে- কাকে বিশ্বাস করা হবে? ইরানকে, নাকি এমন এক ট্রাম্প প্রশাসনকে, যার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে?

পারমাণবিক পরিদর্শন নিয়ে বিরোধ
মঙ্গলবার সকালে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ভবিষ্যতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বোচ্চ মাত্রার পারমাণবিক পরিদর্শনে সম্মত হয়েছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেন, ইরান সম্পূর্ণভাবে এবং নিঃশর্তভাবে দীর্ঘ ভবিষ্যতের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের পারমাণবিক পরিদর্শনে সম্মত হয়েছে (অনন্তকাল পর্যন্ত)। এটি ‘পারমাণবিক সততা’ নিশ্চিত করবে। তারা যদি এতে সম্মত না হতো, তাহলে আর কোনো আলোচনা হতো না।
এর আগে গত সোমবার সুইজারল্যান্ডে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এটিকে “একটি বড় মাইলফলক” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইরান আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে।

তবে ইরান এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, আইএই’র সঙ্গে তাদের সহযোগিতা ‘বর্তমান পদ্ধতি অনুযায়ী’ চলবে। ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দেয়া বা নতুন কোনো প্রতিশ্রুতির বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএই’র ইতিমধ্যেই ইরানে সীমিত পর্যায়ে প্রবেশাধিকার রয়েছে। ফলে শুধু সংস্থাটিকে প্রবেশের অনুমতি দেয়াই বড় কোনো অগ্রগতি নয়।
তবে ট্রাম্প নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। মঙ্গলবার বিকেলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ওরা ভুল বলছে। আমাদের কাছে শতভাগ পরিদর্শনের বিষয়টি নিশ্চিত আছে। যদি ইরান ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে আমি এখনই আলোচনা বাতিল করে দেব।
অবমুক্ত ইরানি সম্পদ কি মার্কিন পণ্য কিনতেই ব্যবহার হবে?

ট্রাম্প প্রশাসন আরও দাবি করছে, শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে অবমুক্ত করা হতে পারে এমন ইরানের শত শত বিলিয়ন ডলারের সম্পদ শুধুমাত্র মার্কিন কৃষিপণ্য ও মানবিক সামগ্রী কেনার জন্য ব্যবহার করা হবে।

সমালোচকদের আশঙ্কা, এই অর্থ ইরান তার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন বা আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়নের জন্য ব্যবহার করতে পারে। এমনকি অনেক রক্ষণশীল মার্কিন রাজনীতিকও চুক্তিতে ইরানকে এত বড় আর্থিক সুবিধা দেয়ার সমালোচনা করেছেন।
জেডি ভ্যান্স জানান, প্রধান আলোচক জ্যারেড কুশনার এমন একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছেন, যেখানে অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেবে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার। তার ভাষায়, এই অর্থ দিয়ে মার্কিন সয়াবিন, ভুট্টা ও গম কেনা হবে, যা ইরানের জনগণের উপকারে আসবে।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজও বলেন, তারা আমেরিকান কৃষিপণ্য কিনবে। ট্রাম্পও দাবি করেন, অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার জন্য ব্যবহার করা হবে।

তবে পরে এক সাক্ষাৎকারে ওয়াল্টজ স্বীকার করেন, এই অর্থ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সে বিষয়টি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
অন্যদিকে জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আলি বাহরেইনি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইরানই একমাত্র দেশ, যারা নিজেদের সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করবে তা নির্ধারণ করবে। অন্য কোনো দেশের এ বিষয়ে প্রভাব রাখার দাবি আমি প্রত্যাখ্যান করছি।

হরমুজ প্রণালিতে টোলমুক্ত চলাচল নিয়েও মতবিরোধ
এমওইউতে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ৬০ দিনের জন্য বিনা খরচে অনুমোদিত হবে।
কিন্তু এরপর কী হবে, সে বিষয়ে দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন।
গত সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, প্রণালিটি স্থায়ীভাবেই টোলমুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, কেউ কেউ বলছে এটি শুধু কিছু সময়ের জন্য টোলমুক্ত। না, এটি স্থায়ীভাবে টোলমুক্ত হবে।

সোমবারও তিনি একই দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আমাদের এমন একটি চুক্তি হয়েছে, যেখানে এটি খোলা থাকবে এবং কোনো টোল নেয়া হবে না।
কিন্তু ইরান এ ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। বরং তারা নির্দিষ্ট সেবার জন্য ফি আরোপের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান ইতিমধ্যেই সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু করেছে।
এমনকি বিষয়টি এতটাই অমীমাংসিত যে ট্রাম্প সম্প্রতি হুমকি দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে এবং নিজেরাই জাহাজ চলাচলের জন্য ফি আদায় করবে।

কাকে বিশ্বাস করা যাবে?
সাধারণত ইরানের মতো কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের বক্তব্যের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হয়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের অতীত রেকর্ড সেই হিসাবকে জটিল করে তুলেছে।

ট্রাম্প গত কয়েক মাস ধরে বারবার দাবি করেছিলেন যে ইরানের সঙ্গে চুক্তি “প্রায় হয়ে গেছে” এবং তেহরান তার সব শর্ত মেনে নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
এছাড়া গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছিল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি “সম্পূর্ণ ধ্বংস” হয়ে গেছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন সেই দাবিকে সমর্থন করেনি।

বর্তমান আলোচনার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প আগে অস্বীকার করেছিলেন যে চুক্তিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল থাকবে। কিন্তু পরে প্রকাশিত এমওইউতে এমন একটি তহবিলের অস্তিত্ব দেখা যায়।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমওইউর খসড়াকে ‘প্রচারযুদ্ধ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে প্রকাশিত চূড়ান্ত নথির সঙ্গে সেই খসড়ার উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাবি করা এসব গুরুত্বপূর্ণ ছাড় সত্যিই এত দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো কেন এমওইউতে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো না- এই প্রশ্নের জবাব এখনও অস্পষ্ট।

ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কিছু বিষয় প্রকাশ্যে আনা হয়নি এবং কিছু সমঝোতা গোপন পর্যায়ে রয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বর্তমানে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, ফলে “আমাদের বিশ্বাস করুন” ধরনের ব্যাখ্যা জনমতকে সন্তুষ্ট করতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন