বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য দ্রুত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে মালয়েশিয়া। একইসঙ্গে নতুন বিদেশি শ্রমিক কোটার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ,
ন্যায়সঙ্গত ও বৈষম্যহীন নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে দেশটি। বাংলাদেশি শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন অব্যাহত রাখতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) বৈঠক আয়োজন এবং শ্রম বিষয়ক নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রণয়নের উদ্যোগ নিতেও সম্মত হয়েছে ঢাকা-কুয়ালালামপুর। গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
স্থানীয় সময় সকালে পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তাদের মধ্যে দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারসহ দুই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে কথা হয়। গুরুত্বপূর্ণ ওই বৈঠক শেষে স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন দুই সরকারপ্রধান। প্রথমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আনোয়ার ইব্রাহীম বক্তব্য রাখেন। পরে তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমকে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনার কথা বলেছি। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও উত্থাপন করেছি।
যৌথ সংবাদ সম্মেলন শেষে তারেক রহমানের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়। স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে নিয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের সঙ্গে মধ্যহ্নভোজে যোগ দেন তারেক রহমান। এরপর দুপুরে মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহীম ইবনে আলমারহুম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাক্ষাতের সময় রানী জারিথ সোফিয়াও উপস্থিত ছিলেন।
যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের শ্রমিক নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রস্তাবে মালয়েশিয়া সম্মত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এক্ষেত্রে দেশটির বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী নতুন বিদেশি শ্রমিক কোটার অনুমোদন নিয়োগকর্তার প্রকৃত চাহিদা এবং সংশ্লিষ্ট খাতের নির্ধারিত সীমার ভিত্তিতে কেস-বাই-কেস পদ্ধতিতে বিবেচনা করা হবে। অনুমোদিত কোটার আওতায় নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত, বৈষম্যহীন ও প্রতিযোগিতামূলক রাখতে এবং কেবল বিশ্বাসযোগ্য ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করতে দুই দেশ একমত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, আমরা একমত হয়েছি যে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে এবং শ্রমিকদের ব্যয় হ্রাস পায়।
এ ছাড়া বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক অভিবাসন নিশ্চিত করতে শিগগিরই যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠকে বিদ্যমান শ্রম বিষয়ক সমঝোতা স্মারকের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং বর্তমান বাস্তবতার আলোকে নতুন ও হালনাগাদ সমঝোতা স্মারক প্রণয়নের ভিত্তি তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
যৌথ বিবৃতিতে ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের সরকারপ্রধান জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং মালয়েশিয়ার উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদানের প্রশংসা করেন। তারা বলেন, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, জনসম্পৃক্ততা ও পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। উভয় নেতা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীম তারেক রহমানের সম্মানে আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। এ সময় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে একাধিক দ্বিপক্ষীয় নথি বিনিময়ও প্রত্যক্ষ করেন দুই নেতা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণের জন্য শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। শ্রম সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এমবিএফটিএ), হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, শিক্ষা, পর্যটন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
দুই দেশ ২০২৭ সালের মধ্যে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার করেছে। একইসঙ্গে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ যৌথ ব্যবসা পরিষদ (জেবিসি) গঠন, জ্বালানি সহযোগিতা সমপ্রসারণ, সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষ জনবল উন্নয়ন এবং হালাল শিল্পে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও একমত হয়েছে।
আঞ্চলিক বিষয়ে আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুই নেতা। এক্ষেত্রে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সংকট সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে মালয়েশিয়া। আনোয়ার ইব্রাহীম বলেছেন, বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত পাঠাতে একত্রে কাজ করবে ঢাকা ও কুয়ালালামপুর। পাশাপাশি আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হওয়ার বাংলাদেশের আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে এ বিষয়ে গঠনমূলক সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের আরসিইপি সদস্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন তিনি।
জাতিসংঘ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা প্রসঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারস্পরিক সমন্বয় আরও জোরদারে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। দুই দেশের সরকারপ্রধান জাতিসংঘ (ইউএন), ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও বহুপক্ষীয় ফোরামে সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তারা আন্তর্জাতিক আইন, ন্যায়বিচার ও নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবপাচার এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধের মতো প্রচলিত ও অপ্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন দুই দেশের সরকার প্রধান। তারা এসব চ্যালেঞ্জকে সমন্বিত ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এছাড়া জাতিসংঘের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক ইস্যুতে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে শান্তি, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের আতিথেয়তা ও আন্তরিকতার জন্য ধন্যবাদ জানান। এ সময় তিনি আনোয়ার ইব্রাহীম ও তার সহধর্মিণী ড. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইলকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী: ওদিকে গতকাল সংক্ষিপ্ত মালয়েশিয়া সফর শেষ করে চীনে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল স্থানীয় সময় রাত ৯টায় চীনের দালিয়ানায় পৌঁছান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক চীন সফর শুরু হবে ২৪শে জুন। এর আগে আজ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘সামার ডাভোস’-এর মূল অধিবেশনে অংশ নেবেন তারেক রহমান। একই দিনে ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন এ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’- শীর্ষক অধিবেশনে অংশ নেবেন। পরের দিন অর্থাৎ ২৪শে জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দালিয়ান থেকে ট্রেনযোগে বেইজিং যাবেন। বেইজিংয়ে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী, পানিসম্পদমন্ত্রী, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সির (সিআইডিসিএ) চেয়ারম্যান এবং চায়না এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন।
সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হবে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) উদ্যোগে আয়োজিত এ ফোরামে প্রধানমন্ত্রী চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবেন এবং বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন।
২৫শে জুন বেইজিংয়ের গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকের পর দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে চীনের প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করবেন।
সফরের শেষদিন অর্থাৎ ২৬শে জুন, চীনের ন্যাশনাল পিপল্স কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। একই দিনে প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। শি-তারেক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতবিনিময় হবে। সফরের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে- দুই দেশের মধ্যে যৌথ ইশতেহার ঘোষণার সম্ভাবনা, যা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।
