স্টারমারের পদত্যাগ এরপর কে?

স্টারমারের পদত্যাগ এরপর কে?

ফন্ট সাইজ:

প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। সোমবার (২২শে জুন) আবেগঘন কণ্ঠে তিনি এ ঘোষণা দিয়েছেন। রাজা তৃতীয় চার্লসকেও এ বিষয়ে অবহিত করেছেন তিনি। তবে নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্টারমার দায়িত্ব পালন করে যাবেন। তিনি জানিয়েছেন, নতুন লেবার নেতা নির্বাচনের জন্য একটি সময়সূচি ঘোষণার জন্য দলের ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ বিষয়ে ৯ই জুলাই মনোনয়নপত্র গ্রহণ শুরু হবে বলেও জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, এতে সেপ্টেম্বরে পার্লামেন্টে লেবার দলের একজন নতুন নেতা নিশ্চিত হবে। ক্ষমতায় আসার মাত্র ২৩ মাসের মাথায় পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন স্টারমার। গত এক দশকে দেশটি ছয়জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে।

পদত্যাগের নেপথ্যে কী?
স্টারমারের এই পদত্যাগের ঘোষণা হুট করে আসেনি। বিগত কয়েক মাস ধরেই তার নিজের দল লেবার পার্টির ভেতরে চাপ বাড়ছিল। তার নেতৃত্বে অসন্তুষ্ট সংসদ সদস্যরা তাকে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সরে দাঁড়ানোর দাবি জানান।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ভূমিধস জয়ের পর বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্টারমার ক্ষমতায় বসেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে লেবার পার্টির জনপ্রিয়তার বিস্ময়কর পতন শুরু হয়। আর এ থেকেই দলটির ভেতরে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। দলটির এমপিরা এই পতন ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির জনসমর্থন কমার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। স্টারমার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ- দুই ক্ষেত্রেই সংগ্রাম করেছেন। স্থবির জীবনমান এবং একাধিক প্রশাসনিক ভুল তার সরকারের দুর্বলতা আরও বাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন তিনি বিতর্কিত সাবেক এমপি পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে বৃটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন কেলেঙ্কারির সঙ্গে পিটার ম্যান্ডেলসনের সম্পর্ক রয়েছে। এ তথ্য প্রকাশের পর ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করা হয়, কিন্তু ততক্ষণে রাজনৈতিক ক্ষতি হয়ে গেছে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আগে থেকেই বলেছিলেন যে, অভিবাসন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ইস্যু স্টারমারের সম্ভাব্য প্রস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। এ ছাড়া সমপ্রতি স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির ভয়াবহ ভরাডুবি হয়। ফলাফলগুলোতে দেখা গেছে, বৃটেনের ঐতিহ্যগতভাবে লেবার সমর্থিত এলাকাগুলোতেই তাদের ভোটব্যাংক ভেঙে পড়েছে, একই সঙ্গে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসেও দলটির সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী কে এই অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, দেশটিতে নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। সব হিসাবনিকাশ বলছে, তিনিই খুব শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। অ্যান্ডি বার্নহ্যাম একজন জ্যেষ্ঠ বৃটিশ লেবার রাজনীতিবিদ। তিনি ২০১৭ সাল থেকে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে লিভারপুলে জন্মগ্রহণ করেন বার্নহ্যাম।

শৈশব ও কৈশোরে তিনি উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠেন এবং মাত্র ১৫ বছর বয়সেই লেবার পার্টিতে যোগ দেন। পরে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা এবং সেখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ২০০১ সালে প্রথমবার বৃটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন বার্নহ্যাম। তিনি লেবার পার্টির টনি ব্লেয়ার এবং গর্ডন ব্রাউন সরকারের সময় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ট্রেজারি এবং স্বাস্থ্য বিভাগসহ বিভিন্ন সিনিয়র পদ।

২০০৮ সালে তিনি সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর ২০০৯ সালে তাকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদে উন্নীত করা হয়। এ ছাড়া বার্নহ্যাম ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) দায়িত্বেও ছিলেন। তিনি দুইবার লেবার পার্টির নেতা হওয়ার চেষ্টা চালালে তা ব্যর্থ হয়। ২০১৭ সালে তিনি পার্লামেন্ট থেকে সরে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হন। মেয়র হিসেবে তিনি পরিবহন, আবাসন ও কর্মসংস্থানসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কাজ করেছেন।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় উত্তর ইংল্যান্ডের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা নিয়ে তার বারবার কঠোর অবস্থানের কারণে তিনি ব্যাপক আলোচনায় আসেন। ওই সময় থেকেই তাকে অনেকেই ‘কিং অব নর্থ’ নামে ডাকতে শুরু করে, যা জনপ্রিয় টিভি সিরিজ গেম অব থ্রোনস থেকে অনুপ্রাণিত একটি উপাধি।

এরপর ২০২৬ সালে বার্নহ্যাম আবার বৃটিশ পার্লামেন্টে ফিরেন। এবার তিনি মেকারফিল্ড আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এই নির্বাচনে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল রিফর্ম ইউকে। দলটি লেবারের থেকে ৯ হাজারের বেশি ভোটে পিছিয়ে পড়ে।

২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে এই আসনে লেবার পার্টি প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কিন্তু বার্নহ্যামের প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণের পর সেই ভোটের হার বেড়ে প্রায় ৫৫ শতাংশে পৌঁছায়। এদিকে সর্বশেষ স্টারমারের পদত্যাগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বার্নহ্যাম নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্নহ্যাম বলেছেন, স্টারমার আমাদের দেশের জন্য বিশাল অবদান রেখেছেন এবং এই রকম একটি চ্যালেঞ্জিং সময়ে তার নেতৃত্ব ও নিষ্ঠার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি আরও বলেন, স্টারমারের এই সিদ্ধান্ত একটি অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যায়ের (ট্রানজিশন) সূচনা করেছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, এই প্রক্রিয়াটি যেন সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল উপায়ে সম্পন্ন হয়। আমি এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করবো।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন