এক দশকে ছয় বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী, সপ্তম কে?

এক দশকে ছয় বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী, সপ্তম কে?

ফন্ট সাইজ:

এক দশক ধরে বৃটেনের রাজনীতি নাটকীয়তায় ভরা। ক্লাইমেক্সের পর ক্লাইমেক্স বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর পদে আসা-যাওয়া নিয়মিত ঘটনা। এই এক দশকের মধ্যে ১০, ডাউনিং স্ট্রিটে এই পদে দায়িত্বে আসেন ৬ জন। তাদের সবারই স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদায় নিতে হয়েছে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে কিয়ের স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি। তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় প্রধানমন্ত্রী পদে কনজারভেটিভ দলের অস্থিরতাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক স্থিরতা আনার বিষয়টি ফলাও করে প্রচার করেন। এখন তার নিজ দলের সেই সুসংহত অবস্থান হুমকির মুখে। নিজ দলের প্রতিনিধিরাই এখন তার পদত্যাগ চাইছেন। গত সপ্তাহে স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি প্রায় ১৫০০ পদ হারিয়েছে। এতে স্টারমারের প্রতি আস্থার সংকটে ভুগছে লেবার পার্টির আইন প্রণেতারা। সমালোচকরা এই অবস্থায় ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে চোখ রেখে স্টারমারের পদত্যাগ চাইছেন। তবে তার মিত্ররা বলছে এমন পদত্যাগ কনজারভেটিভ দলের অবস্থার পুনরাবৃত্তির সূচনা করতে পারে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের রাজনীতি বিষয়ের প্রফেসর টনি ট্রাভের্স বলেন, বৃটেন প্রধানমন্ত্রী পদে নাটকীয়তায় আসক্ত হয়ে গিয়েছে। তিনি ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট এবং বেক্সিটের কারণে তৈরি হওয়া সংকটকে দায়ী করে বলেন, এর ফলে সরকারের পক্ষে অনিশ্চয়তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদে রদবদল করা সহজ প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির চেয়ে। তবে প্রধানমন্ত্রী বদল মানেই যে, মৌলিক কিছু পরিবর্তন হবে তা নয়। বর্তমানে লেবার পার্টির অনেক আইনপ্রণেতাই নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৫ জনকে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে এসে চলেও যেতে হয়েছে।

ডেভিড ক্যামেরন, বেক্সিটে বিধ্বস্ত
২০১০ থেকে ২০১৬ সাল অব্দি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডেভিড ক্যামেরন। এ সময়ে তিনি বেক্সিট প্রশ্নে গণভোটের ডাক দেন। তিনি নিজে এর বিরোধিতা করেছিলেন এবং আশা করেছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থেকে যাবে বৃটেন। কিন্তু গণভোটে বেক্সিটের পক্ষে রায় এলে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। এসময় তিনি বলেন, যেহেতু জনগণ এই রায় দিয়েছে তাই এমন কেউ দেশের নেতৃত্বের যোগ্য যিনি দ্রুত জনতার রায় বাস্তবায়ন করবেন। যদিও তিনি দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে তিন মাস দায়িত্ব পালনের কথাও উল্লেখ করেন। তবে কনজারভেটিভ দলের নেতৃত্ব নির্বাচনে তেরেসা মে’র নিকট পরাজিত হলে তিনি দায়িত্ব থেকে ইস্তফা নেন।

তেরেসা মে, বেক্সিটে ডোবেন তিনিও
ক্যামেরন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তেরেসা মে। মার্গারেট থ্যাচারের পর বৃটেনের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০১৬ সালের ১৩ই জুলাই দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ক্ষমতায় এসে দ্রুত ইইউ’র সঙ্গে বেক্সিট আলোচনার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন মে। ১০, ডাউনিং স্ট্রিটে তিনি ব্যস্ত সময় পার করেন বেক্সিট নিয়ে। মে চেয়েছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বের হয়ে যাওয়া কঠোর না হোক। এতে তিনি নিজ দলের কট্টরপন্থিদের চাপের মুখে পড়েন। তিনি এমন প্রস্তাব গঠনে ব্যর্থ হন যা তার দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। তিনিও বেক্সিট কার্যকরে সফল হতে পারেননি। এতে মন্ত্রিসভার বিদ্রোহের মুখে পড়ে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করার কথা জানান তিনি।

বরিস জনসন, পার্টিগেট কেলেঙ্কারিতে ফেঁসে পদত্যাগে বাধ্য
লন্ডনের সাবেক এই মেয়র তেরেসা মে’র পর কনজারভেটিভ দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি ক্যামেরন ও তেরেসা মে সরকারের বেক্সিট নীতির কড়া সমালোচনা করেন এবং বেক্সিটের পক্ষে জোরালো সমর্থন দেন। বৃটেনের সীমান্ত পুনরুদ্ধারের ইশতেহার দিয়ে তিনি ক্ষমতায় আসেন। এর কিছুদিন পর করোনা শুরু হলে তিনি বিপাকে পড়েন। করোনা শেষ হলে একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এরমধ্যে অন্যতম ছিল করোনার সময়ে তার অফিসে আয়োজিত এক পার্টি। যখন দেশ জুড়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কড়া নির্দেশনা ছিল এবং লকডাউন চলছিল সেই সময়ে তার এমন পার্টি করা নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় যা পার্টিগেট কেলেঙ্কারি নামেও পরিচিত। এতে ২০২২ সালে পদত্যাগে বাধ্য হন তিনি।

লিজ ট্রাস, লেটুসের চেয়েও কম টিকেছেন যিনি
বরিস জনসনের স্থলে কে আসবেন ক্ষমতায় তা নির্ধারিত ছিল না। লিজ ট্রাস কনজারভেটিভ পার্টির ক্ষমতায় আসেন ঋষি সুনাককে পরাজিত করে এবং প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হন সেপ্টেম্বর ২০২২ সালে। বরিস জনসন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন ট্রাস। তিনি মাত্র ৬ সপ্তাহ ক্ষমতায় থাকতে সক্ষম হন। তাকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে চাউর হয়, ‘লেটুস আউটলাস্ট ট্রাস।’ বৃটেনের সবচেয়ে কম সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। তার এই স্বল্প সময়ের মধ্যে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ মৃত্যুবরণ করেন। তহবিল ছাড়াই কর ছাড়ের প্রস্তাবনা দিলে বৃটেন জুড়ে আর্থিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।

ঋষি সুনাক, সাধারণ নির্বাচনে বিদায়
ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় বসেন ঋষি সুনাক। ২০২২ সালের অক্টোবরে কনজারভেটিভ দল থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেন তিনি। তার ক্ষমতাকালে তিনি পূর্বসূরিদের তৈরি করা সমস্যার জালে জর্জরিত হন। এর ফলে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার দলের ভরাডুবি হয়। পরাজিত হওয়ার পর ডাউনিং স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, আমি দুঃখিত। এই পদে আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়েছি। কিন্তু আপনারা আপনাদের পরিষ্কার মতামত দিয়েছেন, বৃটেনের সরকার পরিবর্তন হওয়া উচিত। এবং আপনাদের রায়ই চূড়ান্ত।
কিয়ের স্টারমার, স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবির বলি: ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সাধারণ নির্বাচনে বিশাল জয় নিয়ে ১০, ডাউনিং স্ট্রিটের ক্ষমতায় এসেছিলেন বাম-ঘেঁষা লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমার। তবে শুরুটা ভালো করলেও শেষ অব্দি নিজের ক্ষমতার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারলেন না তিনিও। ২২শে জুন তাকে এক আবেগঘন বক্তব্যে বিদায় জানাতে হয় লেবার পার্টির নেতৃত্ব থেকে। এতেই তার প্রধানমন্ত্রিত্বেরও বিদায় ঘণ্টা বেজে যায়। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করলেই তার মেয়াদকাল শেষ হবে। মাত্র দুই বছরের মাথায় তার জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যর্থতা, ভেঙে পড়া সরকারি পরিষেবা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারায় তার সরকার চরম সংকটে পড়ে। এর ওপর বিতর্কিত ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনের বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে বৃটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত স্টারমারের কর্তৃত্বকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। গত মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির শোচনীয় পরাজয়ের পর বহু এমপি স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেন। তবে স্টারমার পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানালে দলের সিনিয়র নেতারা তাকে সরানোর কৌশল নেন। মে মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, যেখানে আমাদের দূরদর্শিতার প্রয়োজন, সেখানে এখন এক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এরপরই মেকারফিল্ডের লেবার এমপি জশ সাইমনস পদত্যাগ করে উপ-নির্বাচনের পথ তৈরি করেন, এতে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সংসদে ফিরে আসার সুযোগ পান।

কে হবেন সপ্তম জন? স্যার কিয়ের স্টারমারের বিদায়ের আগেই বৃটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয়ে গিয়েছিল। মেয়র পদ থেকে সরে গিয়ে এমপি পদে নির্বাচন করে ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টে প্রবেশ করেছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তিনি অতি অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী পদে চোখ রেখেই তার মেয়র পদ ছেড়েছেন। লেবার পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণে তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তবে স্টারমারের মন্ত্রিসভার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন তিনি লেবার দলের নেতৃত্বের জন্য লড়াই করবেন। সবকিছুর ফয়সালা হবে আগামী দেড় মাসের ভেতরই। স্টারমার তার পদত্যাগের ঘোষণায় পরবর্তী প্রধান নির্বাচনের সময় নিয়ে ধারণা দিয়েছেন। তবে সবকিছু বিবেচনায় অ্যান্ডি বার্নহ্যামই এগিয়ে আছেন বৃটেনের রাজনীতির সবচেয়ে উত্তাল দশকে সপ্তম ব্যক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর উত্তপ্ত চেয়ারে বসতে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন